
ক্বারী মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রব (বিসমিল্লাহ হুজুর) (রহ.) এর জীবন ও কর্ম
এ এস এম সাইফুল্লাহ ॥
আজ ৩১ মার্চ ২০২৩ ক্বারী মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রব (বিসমিল্লাহ হুজুর) (রহঃ) এর ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী। গত ৩১ মার্চ ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ বেলা বারোটা বিশ মিনিটে মানিকগঞ্জ জেলার শহীদ রফিক সড়কে তাঁর নিজ বাসায় আমার শ্রদ্ধেয় পিতা, মানিকগঞ্জ জেলা তথা দেশের একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ আব্দুর রব (বিসমিল্লাহ হুজুর) ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
একজন আলেমের মৃত্যু মানে সমস্ত আলমের মৃত্যু। ক্বারী আব্দুর রব সাধারণ কোন আলেম ছিলেন না। আমি তাঁকে দেখেছি, দেখিছি আমাদের ঘরে, রাজপথে, ভ্রমণে। তিনি এক অসাধারণ আলেম ছিলেন। অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন।
আমি তাঁর অহম দেখেছি খুব কাছাকাছি বসে, কোন অহংকার তাঁর ছিলো না। আমি দেখেছি তাঁর অনেক সরলতা, ঈমানদারী, রাসুল প্রেম, মানুষের প্রতি দরদ, ইনসাফ, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি। আমি আমার শ্রদ্ধের পিতাকে বুঝতে চেষ্টা করেছি নিজের জীবনের সকল অভিজ্ঞতা দিয়ে। তিনি জীবনে কোন অন্যায়ের সাথে নূন্যতম আপোষ করেননি। যেথায় যখনই কোন অন্যায় দেখেছেন তাৎক্ষনিক তার প্রতিবাদ তিনি করেছেন।
আব্দুর রব (রহঃ) এর জন্ম ঃ
১৯৪৫ সালের ১০ ই ফেব্র“য়ারী তিনি তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জ মহকুমার বর্তমান সাটুরিয়া থানাধীন গোলড়া গ্রামে এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে হাজী মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন (রহঃ) ঔরসে হযরত মাওলানা ক্বারী মোহাম্মদ আব্দুর রব (রহঃ) জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর শ্রদ্ধেয় দাদা হাজী বাবর আলী তৎকালে অত্র এলাকায় বিপুল পরিমান জমির মালিক ছিলেন। সেসব জমি চাষে গোলড়া তার নিজ বাড়ীতে ৮০ জন রাখাল সার্বক্ষনিক নিয়োজিত ছিলো। তার চাচা প্রিন্সিপ্যাল ইয়াকুব আলী তৎকালীন পাকিস্তানের শিক্ষাবিদ হিসেবে স্বর্নপদক পেয়েছিলেন।
শিক্ষা জীবন ঃ
ছোট বেলা থেকেই আব্দুর রব (রহঃ) খুবই মেধাবী ছিলেন পাঁচ বছর বয়সে এই গ্রামের মসজিদে তিনি সর্ব প্রথম বোগদাদী কয়দা পড়তে শুরু করেন। সাত বছর বয়সে তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে ভর্তি করেন পুরান ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায়। সেখানে তিনি মাওলানা মোহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (র.)র তত্বাবধানে চার বছর লেখাপড়া করে চলে আসেন তার নিজ জেলায়। লালবাগ মাদ্রাসায় পড়া-লেখা করা কালীন পবিত্র কোর আনে কারীম সহীহ শুদ্ধভাবে শেখেন। এর পর ২ বৎসর তিনি ক্বারীআনা পড়েন। তিনি সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। তার সুমধুর সুরে কোরআন তেলায়াতে মুগ্ধ হয়ে যান মাদ্রাসার ওস্তাদরা।
লালবাগ মাদ্রাসায় পড়াকালীন তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন, মাওলানা হাফেজ্জী হুযুর (রহঃ), শাইখুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক (রহঃ), আল্লামা যফর আহমদ উসমানী, মাওলানা হেদায়তুল্লাহ (র.) প্রমুখ ।
১৯৬১ সালে আব্দুর রব (রহঃ) ইষ্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারী বোর্ডের অধীনে এস এস সি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র মহাবিদ্যালয় (বর্তমানে দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) এ এইচ এস সি কলা বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৬৪ তিনি কৃতিত্বে সাথে এইচ এস সি পাশ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবী বিভাগে বি এ ভর্তি হন পরবর্তীতে ১৯৬৭ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবীতে এম এ পাশ করেন। কলেজ জীবনে তিনি কলেজের বাংলা র্নিধারিত বক্তৃতা, গল্প বলা, কোরআন তেলাওয়াত, উপস্থিত বক্তৃতায় সবসময় প্রথম স্থান অধিকার করতেন। এছাড়া খেলাধুলায় সাইকেল রেসে ও হা-ডু-ডু খেলায় তিনি ছিলেন পারদর্শী।
কর্ম জীবন ঃ
শিক্ষা জীবন শেষ করার পর শিক্ষকতার জন্য বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি তাঁর শ্রদ্ধাভাজন পিতা হাজী বিল্লাল হোসেন (রহঃ) এর নিদের্শে চলে আসেন নিজ এলাকায়, এখানে একটি হাইস্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান। এখানেই তৎকালীন চল্লিশ টাকা বেতনে তাঁর কর্মজীবন শুরু।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মানিকগঞ্জ বাজার মসজিদ, দেবেন্দ্র কলেজ জামে মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি আনসার বাহিনীতে সহকারী এ্যাডজুটেন্ড হিসেবে মানিকগঞ্জ মহকুমায় যোগদান করেন। সেখান ১ বছর কর্মরত অবস্থায় তৎকালীন আনসার জেলা এ্যাডজুটেন্ট এর দূর্নীতি ও অনিয়ম দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি চাকুরী হতে অব্যাহতি নেন। এরপর তিনি শপথ করেন জীবনে কোনদিন চাকুরী করবেন না ব্যবসা করে ভাগ্যের উন্নতি ঘটাবেন।
এরপর তিনি ১৯৭১ সালে মানিকগঞ্জ মহকুমা জেলা শহরে বিসমিল্লাহ কিতাব ঘর নামে একটি পুস্তক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। ব্যক্তিগত জীবনে আব্দুর রব (রহঃ) ছিলেন একজন সফল পুস্তক ব্যবসায়ী। ব্যবসার পাশাপাশি তিনি সামাজিক কাজগুলো করতেন নিয়মিত। মানিকগঞ্জ বাজার জামে মসজিদে দীর্ঘ ১২ বৎসর তিনি বিনা বেতনে ইমামতিও করেছেন। এছাড়াও সরকারী দেবেন্দ্র কলেজ মসজিদ, পশ্চিম দাশড়া দারুল আমান জামে মসজিদের খতিবের দায়িত্বও পালন করেছেন।
আব্দুর রব (রহঃ) এর সংসার জীবন ঃ
আব্দুর রব (রহঃ) ১৯৬৭ সনে বরিশালের চরমোনাইয়ের পীর সাহেব মরহুম মাওলানা সৈয়দ এসহাক (রহঃ) এর বাইয়াত গ্রহন করেন। একপর্যায়ে চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ এসহাক (রহঃ) আব্দুর রব (রহঃ) এর চরিত্র মাধুর্য ও তার কর্মস্পৃহায় মুগ্ধ হয়ে চরমোনাইয়ের মাহফিলের পরিচালনার ভার দেন। ১৯৬৮ সালে চরমোনাইয়ের পীর সৈয়দ ইসহাক (রহঃ) মানিকগঞ্জ জেলা সফরে এলে আব্দুর রব (রহঃ) এর পিতা হাজী বিল্লাল হোসেন (রহঃ) তার ছেলের জন্য পাত্রী চান। তখন সৈয়দ এসহাক (রহঃ) তার মেয়ের ঘরের নাতনী সাইয়্যেদা সুলতানা রাজিয়া (রুনু) কে আব্দুর রব (রহঃ) এর সাথে বিয়ের প্রস্তাব দেন। হাজী বিল্লাল হোসেন (রহঃ) এ প্রস্তাব অত্যন্ত সানন্দে গ্রহন করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে চরমোনাইয়ের বাৎসরিক মাহফিলে হুজুর নিজে তার নাতনীর সাথে বিয়ে দেন। মাহফিলে উপস্থিত হাজার হাজার মুসুল্লী নতুন বর-কণের জন্য দোয়া করেন। ৪৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের জনক ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবন ঃ
ছাত্র জীবনে তিনি যে শিক্ষকদের সংস্পর্শ পেয়েছেন তাদের অধিকাংশ-ই ছিলেন বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের সর্বভারতীয় নেতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কাঙ্খিত ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তিনি উলামায়ে কেরামদেরকে নিয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে হযরত হাফেজ্জী হুজুর খিলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক দিলে আব্দুর রব (রহঃ) তাতে সাড়া দেন। ১৯৮২ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে যোগদান করেন। তিনি মানিকগঞ্জ জেলা জামায়াতের রুকন (সদস্য) ছিলেন।
সামাজিক জীবন ঃ
আব্দুর রব (রহঃ) ছিলেন অত্যন্ত সাদা মনের প্রচার বিমুখ মানুষ। তিনি একাধারে ছিলেন দানশীল, বিনয়ী, ঈমানদারী, রাসুল প্রেম, মানুষের প্রতি দরদ, ইনসাফ, দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি সামাজিক প্রতিটি ভালো কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে ভালোবাসতেন। তিনি অসংখ্য মানুষকে সহীহ শুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এজন্য তিনি প্রতি রমজান মাসে পবিত্র কোরআন সহীহ শুদ্ধভাবে শিখাতে কোরআনী ট্রেনিং ক্লাস চালু করেছিলেন। যখন যেখানে সুযোগ পেতেন এই কোনআনী তালিম তিনি দিতেন। ফলে তার রয়েছে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী। যারা আজো আব্দুর রব (রহঃ) সাহেবের অভাব হৃদয়ে অনুভব করেন।
এছাড়া তিনি যখনই কোন ব্যাক্তির মৃত্যুর সংবাদ পেতেন সেখানে ছুটে যেতেন তার গোসল, কাফন কাটা, জানাযার নামাজে ইমামতি করে মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করে তবেই ঘরে ফিরতেন। এভাবে অসংখ্য জানাযা নামাজের ইমামতি করেছেন তিনি। অনেক বিশিষ্ট ব্যাক্তি অসিয়ত করে যেতেন যেন তার জানাযার নামাজ তিনি পড়ান। দুই ঈদে আব্দুর রব (রহঃ) তার নিজ গ্রামের ঈদগাঁ মাঠে নামাজের ইমামতি করতেন। সেই ঈদগাঁ মাঠের মুসুল্লীরা আজও তার অভাব অনুভব করেন।
সামাজিক জীবনে আব্দুর রব (রহঃ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠনের মধ্যে অন্যতম হলো-১। গোলড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা দাতা সদস্য। ২।ধানকোড়া হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৩। মানিকগঞ্জ শহরে শহীদ তিতুমীর একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৪। নিজ গ্রামে ঈদগাঁ মাঠের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৫। গোলড়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৬। গোলড়া হাফিজিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৭। নিজ বাড়ীতে জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৮। মানিকগঞ্জ জেলা শহরে বাসষ্ঠ্যান্ডে বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের নিয়ে চিকিৎসা সেবা দেবার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ইসলামাী ব্যাংক কমিউনিটি হাসপাতাল । মানিকগঞ্জ শহরে ইসলামী ব্যাংক শাখা খোলার ব্যাপারে তার তৎপরতা ছিলো সবচেয়ে বেশী।
এছাড়াও জেলার বিভিন্ন স্থানে স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা,মসজিদ প্রতিষ্ঠায় তিনি তার দানের হাতকে বাড়িয়ে দিতেন। এভাবে সমাজের প্রতিটি ভালো কাজে তিনি সকলকে উৎসাহিত করতেন।
ব্যাক্তি জীবনে মোট ১৩ বার তিনি হজ্বে গমন করেছেন ঃ
হযরত আব্দুর রব (রহঃ) ব্যক্তি জীবনে মোট ১৩ বার হজ্ব করেছেন। প্রতিবছরই তিনি হজ্বে যেতেন তার প্রতিষ্ঠিত বিসমিল্লাহ হজ্ব কাফেলা নিয়ে। তার সাথে যারা হজ্বে যেতেন সবাই তার সেবা পেয়ে সঠিকভাবে হজ্ব করতে পেরে খুশী হতেন। প্রাণ ভরে দোয়া করতেন।
সুস্থ, সুঠামদেহী মানুষটি হঠাৎ অসুস্থ ঃ
আব্দুর রব (রহঃ) ছিলেন সুঠামদেহী, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। জীবনে কোন অসুস্থতাকে পরোয়া করতেন না তিনি। ৭৩ বৎসর বয়সেও ছিলেন দিব্যি সুস্থ। তিনি প্রচন্ড পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন । জীবনে কাজ ছাড়া কিছুই বুঝতেন না। জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কাজে লাগানোর চেষ্টা করতেন। ২০১৩ সালের ফেব্র“য়ারী মাসে হঠাৎ আমার পিতা কিছুটা অসুস্থতা বোধ করলেন। পেটে ব্যাথা। ডাক্তার দেখানো হলো কিন্তু ডাক্তাররা কোন রোগ খূঁজে পাওয়া গেলো না। অনেক পরীক্ষা নীক্ষায়ও রোগ ধরা পড়লো না। পরবর্তীতে ঢাকার গ্যাষ্ট্রো লিভার হাসপাতালে পরীক্ষা নীরিক্ষায় গ্যাষ্ট্রিক আলসার ও পেটের পেসক্রিয়াসে টিউমার ধরা পড়লো। ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত হলো। ২০১৩ সালে ৬ই রমজান ঢাকার গ্যাষ্ট্রোলিভার হাসপাতালে অপারেশন করা হয়। কিন্তু তাতেও লাভ হলোনা। পরবর্তীতে আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যে সিংগাপুর মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে পাঠানো হয় তাকে। সেখানে একমাস চিকিৎসা নেবার পর দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে মিরপুর ডেলটা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বেশ কিছুদিন।
“ইন্তেকালা ইলা-রাহমাতিল্লাহ” ঃ
৩১ মার্চ ২০১৪ ফজরের নামাজ পড়ার জন্য আব্বাকে জাগাতে গিয়ে দেখলাম আব্বাজান তায়াম্মুম সেরে শুয়ে শুয়ে ইশারায় নামাজ আদায় করছেন। আমি কাছে কিছুক্ষন দাঁড়ালাম। নামাজ শেষে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আব্বা বললেন আমি নামাজ আদায় করেছি। তুমি নামাজ আদায় করে আমার জন্য খাবার নিয়ে আসো। যথারিতি আমি নামাজ সেরে আব্বাকে খাওয়ালাম। অন্যদিনের চেয়ে সেদিন আব্বাকে দেখে আমার কেন জানি মনে হলো আব্বা হয়তো আর বেশিদিন আমাদের মাঝে থাকবেন না। সামান্য কিছু খাবার খেয়ে আর খেতে পারলেন না। সকাল ৯ টার দিকে আব্বার অসুস্থতা আরো বেড়ে গেলো। আব্বা জোরে জোরে জিকির করছেন আর সবাইকে বলছেন তার কাছে কাছে থাকতে। আমার অস্থিরতা দেখে আব্বা বললেন তুমি ডাক্তার নিয়ে ব্যস্ত হয়ো না। আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে তুমি একটু কাছে কাছে থাকো। ইতিমধ্যে আম্মাকে বলে ফেললেন আমি তোমাদের মাঝে কিছু সময় আছি। আম্মা বুঝে ফেললেন আব্বা চলে যাচ্ছেন।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে আব্বার মৃত্যু যন্ত্রনা আরো বেড়ে গেলো তিনি আমার সব ভাই-বোন, নাতি-নাতনিদেরকে ডেকে কাছে নিলেন সবাইকে দরুদে শেফা পড়তে বললেন তিনি নিজেও দোয়া দরুদ পড়ছেন হরদম। কয়েকবার উঠবস করলেন করবেলা সাড়ে বারোটার দিকে বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে অজু চলে যাওয়ায় তায়াম্মুম করলে অজু নবায়ন করে নিলেন। এটাই ছিল তার শেষ তায়াম্মুম জিকির করতে করতে চলে গেলে মহান আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে। ইন্তিকালা ইলা-রাহমাতিল্লাহ। (ইন্নালিল্লাহি ও ইন্না ইলাহি-রাজিউন।
জানাযা ও দাফন ঃ
খুব অল্প সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিলাম আব্বার ১ম জানাযা হবে সরকারী দেবেন্দ্র কলেজ ময়দানে বাদ আসর সেই মোতাবেক শহরে মাইকিং করা হলো। বাদ আসর সরকারী দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে নামাযে জানাযায় মানুষের ঢল নামলো। অনেকেই মন্তব্য করলেন এই প্রথাম এই মাঠে এতবড় জানাযার নামাজ হলো। যাহোক জানাযায় ইমামতি করলাম আমি নিজেই। ১ম জানাযা শেষে আব্বার লাশ নিয়ে যাওয়া হলো তার নিজ গ্রামের বাড়ী গোলড়ায় । গোলাড়া কবরস্থান ঈদগা মাঠে ২য় নামাজে জানাযা শেষে কবস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন হযরত মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুর রব (রহ.) । গোলাড়া কবরস্থান ঈদগা মাঠে লোকে লোকারন্য হয়েগিয়েছিল। অনেকে মন্তব্য করেছেন এই মাঠে এতবড় জানাযা ইতিপূর্বে আর হয়নি।