
বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ভ্রমণের একদিন; ৩য় পর্ব
শোভন সারোয়ার:
“বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ভ্রমণের একদিন” সিরিজের ৩য় পর্বে আমরা ঘুরে আসবো মীরকাদিম পৌরসভার ঐতিহাসিক বাবা আদম মসজিদ, বিখ্যাত কমলাঘাট ও ধ্বংস নগরী ‘নগর কসবায়’।
আরও পড়ুন : প্রথম পর্ব বিক্রমপুর ঐতিহ্য ভ্রমণ
নগর কসবা সম্পর্কে প্রথম ধারণা পাই ফেসবুকের কল্যাণে ২০১৮ তে। সাদিফুজ্জামান দিগন্ত নামের এক ভাইয়ের ওয়ালে একটি পুরনো দালানের ছাঁদে তোলা গোধুলীবেলার ছবি দেখে প্রথমবার আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তখনও বিক্রমপুরের ইতিহাসপ্রাচীন এই জায়গা সম্পর্কে আমার জানা ছিল না। আরও বিস্তারিত জানতে আব্বুর সাহায্য নেই। কমলাঘাট একসময় ছিল মুন্সিগঞ্জের ব্যস্ততম বাজার ও বন্দর। সেই কমলাঘাট যাওয়ার রাস্তায় নগর কসবার শুনশান নীরবতার কথা আব্বা আমাকে শুনান। গল্প শুনতে শুনতে দেখার আগ্রহটা কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিলো।
আরও পড়ুন : দ্বিতীয় পর্ব বিক্রমপুর ঐতিহ্য ভ্রমণ
একদিন সকালে সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা চৌরাস্তা
থেকে আমরা অটোরিকশায় উঠে পরি। আমরা তিনজন- আমি, সাহিত্যিক বন্ধু মারুফ কামরুল ও সাইফ মাজহার। ৪০ মিনিটের মধ্যে পৌছে যাই সিপাহীপাড়া চৌরাস্তায়। সেখান থেকে নগরকসবার দূরত্ব মিনিট পনেরোর। এক রিকশাওয়ালা মামাকে নগর কসবার কথা বললে তিনি জায়গাটি চিনতে পারছিলেন না৷ পুরানো নগর ও কতকগুলো দালানের কথা বলতে উনি এবার সহজেই চিনতে পারেন। এটাই হলো আঞ্চলিকতা, গ্রামে গঞ্জে গন্তব্য চেনার সহজ সরল পথ। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রিক্সাওয়ালা মামা আমাদের গন্তব্য সীমানায় নিয়ে গেলেন। ছোট্ট ছোট্ট খোপের মত ঘরগুলো ও পরিত্যক্ত দেয়ালের কাঠামো সড়কের দুপাশ থেকে যেন আমাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছিলো। সামনে এগুতেই বড় বড় ধ্বংসপ্রায় দালাল একে একে চোখের সামনে দাড়িয়ে যাচ্ছিল। যেন এক ভিন্ন সভ্যতার ভিতরে প্রবেশ করেছি। রাস্তার দুপারের বাড়িগুলোর ফলকে খোদাই করে ফার্সি হরফে কি জানি লেখা। কুঁজো হয়ে ছোট্ট দরজা দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে দেখি বিশাল করিডর। সারি সারি পুরনো ভবনের মাঝখান দিয়ে করিডর ভিতরে চলে গেছে। যত সামনে যাই অবাক হতে থাকি। ভবন পেড়িয়ে করিডর মিশে গেছে শান বাধানো বড় দিঘিতে। দিঘির ঘাটগুলো দেখলে সহজেই বুঝা যায় একসময় এখানে অভিজাত শ্রেণীর লোকেদের মুখরতা ছিল। এমন বড় বড় দিঘি, অসংখ্য ধ্বংসপ্রায় দালান ও সরু রাস্তা নগর কসবার পরোতে পরোতে বিন্যস্ত হয়ে আছে, যা নগরটিকে ইতিহাসের সাক্ষী বানিয়ে দাড়িয়ে আছে।
বলে রাখা ভালো, প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো ধ্বংসপ্রায় এই নগর কসবার ইতিহাস সুলতানী আমলের। কসবা ছিল বাংলার স্বাধীন সুলতানী আমলে উপ-বিভাগীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র, যা বর্তমানকালের জেলার সাথে তুলনা করা যায়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩৭টি কসবার সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে মুন্সিগঞ্জে দুটির অবস্থান। একটি নগর কসবা ও অপরটি কাজির কসবা।
পানাম নগরের মত সুলতানি আমলে নগর কসবাতেও বণিকরা নগর গড়ে তুলেছিলেন। মুঘল আমলে এর গুরুত্ব কমলেও ব্রিটিশদের সময়ে এটির গুরুত্ব বেড়ে যায়। এখানকার ভবনগুলো তুলনামূলক খুব একটা ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়নি। অবাক করা বিষয় হলো, আজও এসব স্থাপনায় কয়েকটিতে মানুষের বসবাস রয়েছে! নিজেদের থাকার জন্য বসবাসকারীরা মূল স্থাপনাগুলো সুবিধামত বর্ধিতকরণ বা ভেঙে ফেলে এর ঐতিহ্য নষ্ট করছে। এতশত বছরের অযত্ন আর অবহেলার কারণে আমরা ইতিহাস থেকে দূরে চলে এসেছি। অথচ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই নগরটি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে একদিকে যেমন বিক্রমপুরের ইতিহাস সম্পর্কে নতুনদের জানার আগ্রহ বাড়বে, তেমনি গবেষণা ও পর্যটনে নগর কসবা ভুমিকা রাখতে পারবে। বিক্রমপুরের সমৃদ্ধ ইতিহাস সংরক্ষণ ও লালনে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন, জেলা প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সকলের উদ্যোগে নগর কসবার সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
নগর কসবায় ঘুরতে ঘুরতে আমরা দুই ঘন্টা পার করে দেই কোনোরকম ক্লান্তি ছাড়া। তবে কোথাও ঘুরতে গেলে স্থানীয় ভোজনালয়ে আঞ্চলিক খাবার আস্বাদন করার ক্ষুধা আমায় সবসময়ই জেঁকে বসে। কসবার শেষ প্রান্তে ত্রিমোহনীতে দুটি টং দোকান আমাদেরকে কাছে ডাকছিলো। আমরা দোকান থেকে হাতে বানানো সসে মেখে সমুচা ও সিংগাড়া খেয়ে নিই।
নগর কসবা থেকে কয়েকশো মিটার উত্তরে ধলেশ্বরী নদীর পাড়ে অবস্থিত কমলাঘাট বাজার ও বন্দর। গ্রামীণ ছায়া সুনিবিড় পথে হেঁটে হেঁটে চলতে থাকি সেই বিখ্যাত বন্দরের দিকে। ছোট বড় দু-একটি কারখানা ও দোকান চোখে পড়ে। কিন্তু সবগুলোই বন্ধ। অনেকটা নির্জন কোনো অচেনা
জায়গায় প্রবেশের মত। বাজারে প্রবেশ করতেই বিচলিত হয়ে যাই আমরা। যতদূর চোখ যায় শুধু কারখানা, দোকান আর উঁচু ইমারতে ঠাসা চারিদিক। কিন্তু নেই কোনো কোলাহল। নির্জন এই শহরে মাঝে মাঝে দুএকজন মানুষের দেখা মেলে। সামনে এগিয়ে যাই আমরা আর স্থাপনাগুলোর রং খুজতে থাকি।
ব্রিটিশ আমলে কমলাঘাট ছিল পূর্ব বাংলার বৃহত্তর বানিজ্যিক বন্দর। কমলাঘাট বন্দরে তেল, ডাল, আটা ময়দার কারখানার পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন পণ্যের কয়েক শ’ আড়ৎ। বরিশালসহ দক্ষিনাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারকেল, সুপারি, খেসারি, ডাল, তিলসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসতেন পাইকাররা।
এখনও এখানে টিকে আছে পাঁচ-ছয়’শ শিল্প কল-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যাতায়াত অসুবিধা ও ধলেশ্বরীর নাব্যতায় চরম প্রভাব পড়ছে এসব প্রতিষ্ঠানের। এর ফলে এ পথে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। আর দুর্ভোগ তো রয়েছেই।
ঘুরতে ঘুরতে আমাদের সকাল তখন বিকেলে গড়িয়েছিলো। ফেরার পথে স্বল্প সময়ের জন্য রিক্সা থেকে নেমেছিলাম ঐতিহাসিক বাবা আদম মসজিদ ও মাজার দেখতে। সিপাহীপাড়ার পাশ্ববর্তী দরগাবাড়ি গ্রামে অবস্থিত এটি। এই প্রাচীন মসজিদটি ১৪৮৩ সালে মালিক কাফুর কর্তৃক নির্মিত হয়। মসজিদের চত্বরে বাবা আদম শহীদের মাজার অবস্থিত। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণে রয়েছে।
নগর কসবা, কমলাঘাট ও বাবা আদম মসজিদের সুপ্রাচীন দেয়ালের স্পর্শ গাঁয়ে মেখে আমরা সিপাহীপাড়া চলে আসি। সাথে থাকে স্মৃতিতে জমানো কতশত প্রাণহীন গল্প।
লেখক: সদস্য, ঝিকুট ফাউন্ডেশন
sarwarhshovon@gmail.com