
বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ভ্রমণের একদিন; ২য় পর্ব
শোভন সারোয়ার :
ভ্রমণপ্রিয় মানুষ হিসাবে মাসে অন্তত একটা ট্যুর না দিতে পারলে আমার মন ও শরীর কেমন জেনো মৃতপ্রায় লাগে। করোনা মহামারীর সময়ে যখন দূরে কোথাও যেতে পারছিলাম না, তখন নিজেকে চিরিয়াখানায় বন্দী প্রাণী মনে হচ্ছিল। হঠাৎ মাথায় এলো সময়টা নিজ জেলা মুন্সিগঞ্জ তথা বিক্রমপুরকে জানতে ও দেখতে কাজে লাগানো যাক। একদিনের ছুটিতে সাহিত্যিক বন্ধু মারুফ কামরুল ও সাইফ মাজহার গ্রামে আসে। ওদের পেয়ে উৎসাহ অনেকটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বেড়িয়ে পরি ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধানে।
আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল সোনারঙ জোড়া মঠ, শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর পন্ডিতভিটা, বিক্রমপুর বৌদ্ধবিহার, রাজা হরিশ্চন্দ্রের দিঘি ও সুখবাসপুর দিঘি।
প্রাচীন এই জায়গাগুলো টঙ্গীবাড়ী ও সদর উপজেলায় হলেও অনেকটা পাশাপাশি অবস্থিত। আমরা সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা চৌরাস্তা থেকে অটো রিক্সায় চড়ে বসি। প্রথম গন্তব্য বেতকা চৌরাস্তা হয়ে সোনারঙ জোড়া মঠ।

সোনারং জোড়া মঠ।
বেতকা থেকে টঙ্গীবাড়ী বাজারে পৌঁছানোর আগেই পরবে সোনারং গ্রামটি। এই গ্রামের ভিতরে ঢুকে গেছে জোড়া মঠের রাস্তা। কালজয়ী বাঙালি সত্যেন সেনের সোনারং গ্রাম এটি। এই গ্রামে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে উঁচু জোড়া মঠ।
এটি ইতিহাসে জোড়া মঠ হিসেবে পরিচিত লাভ করলেও মূলত এ দুটি জোড়া মন্দির। বড়টি কালী মন্দির আর ছোটটি শিবমন্দির । তাই এই মঠ দুটিকে জোড়া মন্দিরও বলা হয়ে থাকে। রূপচন্দ্র নামের এক হিন্দু বনিক তার বাবা ও মার স্মৃতি রক্ষার্থে এই মন্দির দুটি নির্মাণ করেছিলেন। জোড়া মঠের দক্ষিণ পাশের বিশাল শান বাঁধানো পুকুর এবং ঘাট আমাদের মন কাড়ে। বড় মন্দিরটি তৈরির সময় এ পুকুর খনন করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এই মন্দিরের উপরে রয়েছে ছোট ছোট বহু ছিদ্র। এই ছিদ্রগুলোকে বাসা বেধেছে ঘুঘু, শালিক ও টিয়াসহ নানা জাতের পাখি। এ কারণে সোনারং জোড়া মঠ পাখির কলকাকলিতে বেশ মুখরিত থাকে। আমরা স্যাঁতসেঁতে দেয়াল বেয়ে মঠের কিছুটা উপরেও উঠেছিলাম।

অতীশ দীপঙ্কর পন্ডিতভিটা।
সোনারং থেকে কাছেই টঙ্গীবাড়ি উপজেলা সদর, তারপর মিনিট বিশের দুরত্বে বজ্রযোগিনী গ্রাম। মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বজ্রযোগিনী অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাম। গ্রামের এক নিরিবিলি পরিবেশে অতীশ দীপঙ্করের জন্মভিটা কমপ্লেক্স ও অডিটরিয়াম অবস্থিত।
অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগুরু ও দার্শনিক। দশম-একাদশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালি পণ্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮০ সালে এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তার জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পরে তিব্বত থেকে সুমাত্রা হয়ে ইন্দোচীন পর্যন্ত। ছায়া সুনিবিড় চারিদিকে শান্তির পরিবেশ। গৌতমবুদ্ধের অনুসারী হোক কিংবা হিন্দু- মুসলমান, যে যার মত করে দেয়ালে অঙ্কিত অতীশগাথা অবলোকন করছেন। আমরাও কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নিলাম। পন্ডিতভিটা ও লাইব্রেরি ঘুরে দেখে কিছুক্ষণ শান্তির বিশ্রাম নিয়ে নেই শ্রীজ্ঞানের এই আঙিনায়। এই গ্রামে আরো দেখতে পাওয়া যাবে প্রাচীন জমিদারবাড়ি, শান-বাঁধানো ভগ্নপ্রায় পুকুরঘাট এবং কালের আঘাতে জরাজীর্ণ ঘরবাড়ি। অবাক হয়ে ভাবছিলাম এই গ্রামেরই বাতাসে একদিন শ্বাস নিতেন মহামানব অতীশ দীপঙ্কর। এখানকার পথেঘাটে ধুলো মেখে বড় হয়ে বিশ্ব জয় করেছেন তিনি!

বিক্রমপুর বৌদ্ধবিহার।
সকাল এবার দুপুরে গড়িয়েছে। এবার আমাদের যাত্রাপথ পাশের গ্রাম রঘুরামপুরে। প্রাচীন বিক্রমপুর তথা বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা ছিল বৌদ্ধবিহার ও মন্দিরের সমন্বয়ে গড়া এক পরিকল্পিত জনপদ। বিক্রমপুর অঞ্চলে চলমান প্রত্নতাত্ত্বিক খনন, গবেষণা ও তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে গবেষকেরা এমনটাই ধারণা করছেন। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ তাঁর লেখায় এই অঞ্চলে ৩০টি বৌদ্ধবিহারের কথা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে আটটির সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, ওই ৩০টি বিহারের অনেকগুলোই ছিল প্রাচীন বিক্রমপুরে। রঘুরামপুরে আবিষ্কৃত বিক্রমপুর বৌদ্ধবিহার সেগুলোর অন্যতম। ২০১৩ সালের ২৩শে মার্চ অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যৌথভাবে ১০০০ বছর পুরানো এই নিদর্শনটি আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এখান থেকে প্রায় ১০০ এরও বেশি মূল্যবান মূর্তি ও ভাস্কর্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। অতীশ দীপঙ্করের সময়ে এই অঞ্চলটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্র। চীন, তিব্বত, নেপাল ও থাইল্যান্ডের মত দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও প্রায় ৮০০০ অধ্যয়নকারী ও অধ্যাপক এখানে অধ্যাপনা করতে আসতেন। একান্ত পরিবেশে আমরা প্রাচীন স্থাপনাগুলো চারিদিক থেকে ঘুরে ঘুরে দেখি।
মধ্যাহ্নের প্রখরতা আর পথের ক্লান্তি আমাদের জেঁকে বসেছিলো। তবুও এবার নতুন গন্তব্য। রঘুরামপুরের বিহার থেকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের দিঘির দুরত্ব সিকি মাইলেও কম। বেশ কাছেই রয়েছে সুখবাসপুর দিঘি। এসব দিঘি বিক্রমপুর অঞ্চলের ঐতিহ্য। বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ভ্রমণের প্রথমপর্বে আমি কনকসার দিঘির সৌন্দর্যের কথা তুলে ধরেছিলাম। এবার এই জোড়া দিঘি দুটির স্বরুপে অবগাহনের পালা।

লেখকের সাথে ভ্রমণ সঙ্গী।
স্থানীয় মসজিদ থেকে আমরা ওজু-নামাজ সেরে ফ্রেশ হয়ে নেই। দোকান থেকে হালকা কিছু খেয়ে চলে যাই রাজা হরিশ্চন্দ্রের নির্মিত রহস্যময় দিঘিতে। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে ১০২৫ থেকে ১০২৬ খ্রিস্টাব্দে দিঘিটি খনন করা হয় বলে ধারণা। কেউ কেউ এটাকে মাঘী পূর্ণিমার দিঘিও বলে থাকেন। এ দিঘিকে ঘিরে অনেক গল্প প্রচলিত রয়েছে। বর্তমানে প্রতি বছর এখানে মাঘী পূর্ণিমাতে মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় আগত অনেক লোকই বিশ্বাস করে, এ দিঘিটিতে কোন অলৌকিক শক্তি রয়েছে। এমন বিশ্বাস থেকে আগতরা বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে দিঘিটির পূজা করে থাকে। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশ আমলে এ দিঘির পানি সম্পূর্ণ সেচের জন্য বেশ কিছুদিন চেষ্টা করার পর তারা তাদের চেষ্টা বন্ধ করে করে দেয় পানি না কমার কারণে। রাজা হরিশ্চন্দ্রের দিঘিপাড়ের বিভিন্ন নাম না জানা গাছ, পাখিদের আওয়াজ আর অদ্ভূত এক মায়াবী নিস্তব্ধতা সমগ্র প্রকৃতিকে যেন ঘিরে রেখেছে।

সুখবাসপুর দিঘি।
রামপাল ইউনিয়নের বিশাল আরেকটি দিঘি হলো সুখবাসপুর দিঘি। শীতে হাজার হাজার অতিথি পাখির দেখা মেলে এই দিঘিতে। গ্রীষ্মে শুকিয়ে গেলেও বর্ষায় ফিরে পায় প্রাণ। বিভিন্ন এলাকার মানুষ ঘুরতে আসে এখানে। দিঘিটির সৌন্দর্য এবং বিশালতা যে কাউকে বিমুগ্ধ করে। এর চারদিকের সবুজ বন-বনানী দিঘিটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলেছে। জনশ্রুতি আছে, রামপাল যখন পাল ও সেন রাজাদের রাজধানী ছিল, তখন তারই পাশে গড়ে উঠেছিল অভিজাত এলাকা ‘সুখবাসপুর’। প্রাচীন দিঘিটি সুখবাসপুরের মানুষের পানীয়জলের অভাব পূরণে খনন করা হয়েছিল।
দিঘির সৌন্দর্য উপভোগ ও প্রচলিত নানান উপকথা শুনতে শুনতে আমাদের ক্লান্তি অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে গিয়েছিলো। সে যাই হোক, নিজ জেলার এতসব ঐতিহ্য চোখ মেলে দেখতে দেখতে কখন যে নিজেকে ইতিহাস ক্লাসের সদস্য ভেবে নিয়েছিলাম তার ইয়ত্তা নেই। এই যে অনুভূতির যাত্রা তা অনেকদিন চলতে থাকবে…
লেখক : সদস্য, ঝিকুট ফাউন্ডেশন ও প্রতিনিধি ঝিকুটপত্র।