
বিলুপ্তপ্রায় প্রাকৃতিক সাবান।
আজহারুল ইসলাম:
আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই উদ্ভিদকে টিকিয়ে রাখা একান্ত জরুরী। কিন্তু অবহেলা, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারনে অনেক উদ্ভিদ প্রজাতি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে আমাদের গ্রামগঞ্জের প্রায় সব বাড়িতেই রীঠা গাছ ছিলো। কিন্তু বর্তমানে পুরা এলাকা ঘুরেও একটা রীঠা গাছের সন্ধান পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। এই অবস্থাদৃষ্ঠে মনে হয় এই প্রজন্মের কাছে রীঠা গাছ অজানাই রয়ে যাবে। কারন এর ঘরোয়া ব্যবহার যেমন কমেছে তেমিনি আজকাল আমাদের কারনেই এই উদ্ভিদের দেখাই মিলে না। আজকাল মানুষ রেডিমেট তৈরি জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বেশী। প্রাকৃতিক বিষয় গুলো কেন যেন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়।এটা কি আধুনিকতার ছোঁয়া? তবে প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে আধুনিক হওয়া যায় না। আমরা উদ্ভিদ লতা গুল্ম ধ্বংশ করে কিভাবে নিজেদের আধুনিক হিসেবে দাবী করি এটা আমার বোধগম্য নয়। আজকালের বাচ্চাদের কাছে রীঠা নিয়ে গল্প করলে অনেকেই মনে করবে সপ্তাশ্চর্যের কিছু একটা হবে। আমাদের উচিৎ এইসব উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখা। এদের খোঁজে বের করে বাচ্চাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। এই প্রজন্ম কে উদ্ভিদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা একান্ত জরুরী।

ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে রাজেন্দ্রপুরে একটা রীঠা গাছ ছিলো। এর ইংরেজি নাম Soap berry,Soap nut,Washing nut. বৈজ্ঞানিক নাম
Sopindus trifoliatus L. কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো গত ক’দিন আগে এই পথে যাত্রাকালে একটু কৌতুহল বশতঃ খোঁজ নিলাম কিন্তু রিঠা গাছটি আর নেই। সে জায়গায় গাছটি ছিলো সেখানে এর কোন চিহ্নও পেলাম না কারন রাস্তা উন্নয়ন করতে গিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে। Sapindus জেনাসের প্রায় ৫-১২ টি প্রজাতি আছে যারা লিচু পরিবারের পেরিনিয়াল shrubs অথবা small trees এই পরিবারের (Sapindaceae) আদিনিবাস নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল। এই গনের উদ্ভিদ পর্নমোচি ও চিরসবুজ ও এরা সাধারনত সোপবেরী হিসেবে পরিচিত।কারন এই ফলের পাল্প সাবান তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। এর generic নামটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ Sapo থেকে। sapo মানে “soap” ও indicus মানে হলো ইন্ডিয়া অঞ্চলের অর্থাৎ এই উপমহাদেশের নিজস্ব উদ্ভিদ।এদের পাতা সাধারনত alternate, ১৫-৪০ সেমি লম্বা। ফুলের গঠন লম্বা যৌগিক মঞ্জুরি (large panicles) প্রতিটি ফুল ছোট ও ক্রিমের মত সাদা। ফল ছোট দেখতে সুপারির মত। ফলের খোসা দেখতে চামড়ার মত(leathery skinned)ও ড্রুপ (drupe) জাতীয় ১-২ সেমি(in diameter) ফল পাকলে ধুসর হলুদ বর্নের হয় প্রতিটি ফলে ১-৩ টি বীজ থাকে।
এদের(Soapntus) ড্রুপ জাতীয় ফলে saponins থাকে যাহা প্রাকৃতিক সাবান। এশিয়া ও আমেরিকা মহাদেশের লোকজন এই ফল হাজার বছর যাবৎ ব্যবহার করে আসছে প্রাকৃতিক সাবান হিসেবে, কাপড় ধৌত করনে ও শ্যাম্পু হিসেবে। বিশেষ করে শীতের শেষে পশমি কাপড় এই প্রাকৃতিক সাবান দিয়ে ধুয়ে রাখা হতো। এই সাবান দিয়ে ধুইলে কাপড়ে পোকার আক্রমন হতো না। যেহেতু পুনরায় শীত আসা না পর্যন্ত এই কাপড় গুলো আলমারী কিংবা সিন্দুকে ঢুকিয়ে রাখা হতো।
Sapindus উদ্ভিদ Lepidoptera এর কিছু Larvae ‘র(moths and butterflies) শুককিটের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন Endoclita malabaricus. soapnut এর বীজের নির্যাস Aedes aegypti নামক মশার লার্ভার এনজাইমের কার্যক্ষমতা ধ্বংশ করে দেয় ফলে এ জাতিয় মশার বংশবৃদ্ধি রোহিত হয়। বর্তমানে যেহেতু রীঠা উদ্ভিদ আর দেখা যায়না। তাই সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে এই উদ্ভিদ ধ্বংশের কারনে খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটেছে এটা পরিষ্কার প্রতীয়মান হয়। উদ্ভিদ ধ্বংশের ফলে খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙ্গে যাবার কারনে আমরা অনেক বিপদের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছি। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে একদিন বিভিন্ন রকম অসুখে ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারনে মানব জাতি বিপদের সম্মুখীন হবো তা নিশ্চিত।
আগেকার দিনে উলেন কাপড়, পশমী কাপড ও সিল্কের কাপড় ধৌত করার একমাত্র সাবান ছিলো রীঠা বা সোপ বেরী এছাডাও আমাদের ছেলেবেলায় দেখেছি গ্রামাঞ্চলে শ্যাম্পু কি জিনিষ কেউ জানতো না। মাথা ও চুলের পরিচর্যার জন্য একমাত্র প্রাকৃতিক শ্যাম্পু ছিলো রীঠা বা সোপবেরী। সোনা রূপার দোকানে এই রীঠা দিয়েই পরিস্কার করতো গহনা। আজ এই উপকারী উদ্ভিদ বিপন্ন প্রজাতিতে পরিনত হয়েছে। গ্রামে গঞ্জে খোজে একটি গাছও আর এখন পাওয়া যাবে না। এখনই সময় আর দেরী নয় আমাদের উচিৎ এই তরু কে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সচেতন হওয়া ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা না হয় পারুলের মত একদিন এই উপকারী উদ্ভিদ আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাবে।
ছবিঃ গুগোলের সৌজন্যে।