দেহের ক্ষয়পূরণ বৃদ্ধিসাধন তাপ উৎপাদন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যা ভক্ষণ করি তাকে খাদ্য বলে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অন্যতম মৌলিক চাহিদা হল খাদ্য। মূলত আমাদের অস্তিত্ব খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। তাই সুস্থ সবল জাতি গঠনে প্রতিটি খাদ্য হতে হবে নিরাপদ। খাদ্য নিরাপদ ও পুষ্টি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে রোগাক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে সারা জীবনের রোগী হয়ে যাচ্ছে। খাদ্য বাহিত রোগের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী ও প্রসূতি মহিলা এবং যারা অন্য কোন রোগে আক্রান্ত। দক্ষ ও সতর্ক হাতে খাদ্য তৈরীর উপর খাদ্য নিরাপদতা ও পুষ্টিগুণ বহুলাংশে নির্ভর করে। তাই খাদ্য ক্রয়,প্রস্তুত,রান্না, পরিবেশন ও সংরক্ষণ এর প্রতিটি ধাপে খাদ্য কিভাবে নিরাপদ রাখা যায় সে বিষয়ে সবার সঠিক ধারণা রাখা প্রয়োজন।
খাদ্য অনিরাপদ হওয়ার কারণঃ
প্রাকৃতিক,আমাদের অভ্যাসগত ও অসাবধানতা জনিত কারণেও খাদ্য অনিরাপদ হতে পারে।
খাদ্য প্রধানত চারটি উপায়ে অনিরাপদ হয়।
১|ভৌত উপাদানঃধুলা ময়লা,চুল,পাথর কনা,আবর্জনা ইত্যাদির উপস্থিতি।
২|রাসায়নিক উপাদানঃমানবদেহের জন্যক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ(কীটনাশক,এন্টিবায়োটিক, সংরক্ষণ দ্রব্যের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার,আর্সেনিক,সীসা) ইত্যাদি।
৩|জৈবিক উপাদানঃব্যাকটেরিয়া,ভাইরাস, ছত্রাক ও অন্যান্য অনুজীবের উপস্থিতির ফলে।
৪|অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদানঃকিছু কিছু পদার্থ যেমনঃ গ্লুটেন,ল্যাকটোজ ইত্যাদির উপস্থিতি।
তাহলে নিরাপদ খাদ্য পেতে হলে আমাদের করণীয় কি?
খাদ্য ক্রয় কালীন পছন্দের উপর স্বাস্থ্য সম্মত ও নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তি অনেকাংশ নির্ভরশীল।
খাবার ক্রয়ের সময় বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে। স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত, তাজা,পরিপক্ক, মৌসুমী ফলমূল ও শাক সবজি ক্রয় করতে হবে।অতিপাকা,গলা,কালোদাগ যুক্ত,পোকা যুক্ত,মৌসুম নয় এমন ফল ক্রয় না করা।পরিস্কার ও নিখুঁত খোসাযুক্ত ডিম ক্রয় করতে হবে।উজ্জ্বল এবং গোলাপি ফুলকা,পরিস্কার চোখ দেখে আংগুলের চাপে ডেবে যায় না এমন মাছ ক্রয় করতে হবে।গোলাপি রং কম হাড় ও চর্বিহীন মাংস ক্রয় করতে হবে।প্যাকেট জাত মাংস সঠিক তাপমাত্রা ও মেয়াদ যাচাই করে ক্রয় করা।হিমায়িত খাবার নিখুঁত ভাবে মোড়কাদ্ধ,পরিস্কার,মোড়কের গায়ে মেয়াদ উত্তীর্ণ তারিখ দেখে ক্রয় করা। তৈল,ঘি মোড়কজাত দেখে ক্রয় করা।মেয়াদ ও বিএসটিআই অনুমোদন দেখে ক্রয় করা।চাল,ডাল,আটা,ময়দা,সুজি যথাসম্ভব মোড়কাবদ্ধ দেখে ক্রয় করা।গুটি যুক্ত,ছাতাপড়া, দুর্গন্ধযুক্ত, পাথর,বা অন্যান্য ময়লাযুক্ত দ্রব্য ক্রয় না করা।মোড়কাবদ্ধ বা বোতলজাত দ্রব্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সীল বিহীন, কুচকানো, টেপখাওয়া,ছিদ্রযুক্ত,মেয়াদ উত্তীর্ণ বোতল,প্যাকেট ক্রয় না করা।পরিস্কার গোটা এবং প্রাকৃতিক রংয়ের মসলা ক্রয় করা।ছাতাপড়া, পোকা ও দূর্গন্ধ ও কৃত্রিম রংযুক্ত মসলা ক্রয় না করা।খাদ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে একটি নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুকিপূর্ণ হতে পারে।
খাদ্য নিরাপদে মজুদ বা সংরক্ষণে করনীয়ঃ
দানাদার শস্য ও ডাল পরিচ্ছন্ন ও বায়ুরোধী পাত্রে মেঝ থেকে ৬ ইঞ্চি উপরে এবং দেয়াল থেকে ৬ ইঞ্চি দূরে সংরক্ষণ করতে হবে।মসলা পরিস্কার বায়ুরোধী পাত্রে সর্বদা শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।টাটকা শাকসবজি বাছাই করে ধুয়ে নেট বা ছিদ্রযুক্ত ব্যাগে সংরক্ষণ করতে হবে।পাকা কলা ও কাঠাল ফ্রিজে না রাখাই উত্তম। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য ১-৫ দিনের জন্য সংরক্ষণ করা যায়।মাছ,মাংশ,ডিম ধুয়ে ও শুকিয়ে ফ্রিজে অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখতে হবে। কাচা মাংস ও মুরগি বায়ুরোধী ফুডগ্রেড প্লাস্টিকে ভরে ১-৫ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে।
কাচা ও রান্না করা খাবার কোন অবস্থায় এক সাথে রাখা যাবেনা।
স্বাস্থ্য সম্মত রান্নাঃ
তেল বা চর্বি অধিক তাপে গরম করা হতে বিরত থাকতে হবে। ভাজা পোড়ায় কম পরিমাণে তেল ব্যবহার করতে হবে। পোড়া বা কালো তেল ফেলে দিতে হবে। রান্নায় ডালডা বা বনস্পতি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।বেচে থাকতে নিরাপদ খাদ্যের কোন বিকল্প নেই। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খাদ্যে সংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি চলতে হবে।স্বাস্থ্য বিধিগুলোর মধ্যে রয়েছে-মানুষ,গৃহপালিত প্রাণী ও কীটপতঙ্গ থেকে রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধ, কাচা ও রান্না করা খাবার আলাদা সংরক্ষণ,পর্যাপ্ত সময় ধরে ও সঠিক তাপমাত্রায় রান্না করতে হবে,সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে।
পানির অপর নাম জীবন নয় বরং নিরাপদ পানির অপর নাম জীবন। তাই নিরাপদ পানি ও নিরাপদ কাচামাল ব্যবহার করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই নিজে সচেতন হই এবং পরিবারের সবাইকে যতটুকু সম্ভব ঘরের তৈরী খাবার খেতে দিই। ফ্যাটি বা তৈলাক্ত ভাজাপোড়া অতিরিক্ত তাপে ঝলসানো ফাস্টফুড পরিহার করি, নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতনতা বার্তা পৌছে দেই।
লেখক: স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক, বাংলাদেশ সচিবালয়।