
শোভন সারোয়ার
শীতের উদযাপন সমাপ্ত করে যখন কৃষ্ণচূড়ায় হলুদ ও লাল রঙ্গের আয়োজন ঘটে, মৃদু-গরম দখিনা বাতাস বিক্রমপুরের আলুখেতে ভেঙে পড়া শুকনো পাতায় দোল জাগায়, ঠিক তখন মহা-উদযাপনের আগমনী বার্তা মনকে উৎফুল্ল করে তোলে। বসন্ত এসে গেছে! এই বসন্ত আমার প্রিয় ঋতু। গাছে গাছে আমের মুকুল ও রৌদ্রময় দিনগুলি জানান দিতে থাকে যে, নবীনকে আলিঙ্গন করার এখুনি সময়। নতুন জ্ঞান আর শিকড়ের সন্ধানে তাই আজ বেড়িয়ে পড়া বিক্রমপুরের ঐতিহ্য দর্শনে।
আরও পড়ুন ২য় পর্ব বিক্রমপুরের ঐতিহ্য ভ্রমণ
আমাদের গন্তব্য বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর, একটি সুপ্রাচীন দিঘি, পদ্মানদী ও পদ্মাসেতু, ভাগ্যকূলের নামকরা গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, বালাসুরের জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়ি এবং বিক্রমপুর জাদুঘর। সঙ্গী আমার কাছের বন্ধু ভবানীপুর গ্রামের রাসেল গোরাপী।

স্থানগুলো বিক্রমপুরের লৌহজং ও শ্রীনগর উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত হওয়ায় আমরা নওপাড়াকে ট্যুর রুট হিসেবে বেছে নেই। নওপাড়া বাজারটা অনেকটা ত্রিবেণী সঙ্গমের মত। সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং উপজেলার সংযোগস্থল এই শতাব্দী প্রাচীন গঞ্জটি। নওপাড়া আরো একটি বিশেষ কারণে পরিচিত। সেটি হলো এখানকার স্থানীয় স্পন্স মিষ্টি। তবে আজকে আমাদের উদ্দেশ্য স্পন্সের স্বাদ নেওয়া নয় বরং কয়েক মাইল দুরের কনকসার গ্রাম।

নওপাড়া থেকে চা চুমুক সেরে বেলা দশটায় আমরা অটোরিকশায় চেপে বসলাম মালির অংক বাজারের উদ্দেশ্যে। মালির অংক থেকে আবার কনকসার গ্রাম। কনকসার বাজারের কিছু আগে হঠাৎ চোখে পড়ে বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরের প্রধান ফটকটি। ফটকের গায়ে গ্রন্থ জাদুঘরের পাশাপাশি লেখা রয়েছে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় কার্যালয়। আমরা জাদুঘর অভিমুখে এগিয়ে গেলে দেখা হয় স্থানীয় এক হিন্দু ধর্মাবলম্বী খালার সাথে। উনি সহাস্যে আমাদের পথ দেখিয়ে দেন। প্রথমেই প্রবেশ করি রহমান মাষ্টার স্মৃতি পাঠাগারে। কিছু বই দেখতে দেখতে কথা হয় সেখানকার দায়িত্বশীল কিউরেটর ম্যামের সাথে। উনি জাদুঘরটি বন্ধ থাকার কথা বলেন। তবে আমাদের জানার আগ্রহ ও সিরাজদিখান থেকে গিয়েছি শুনে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। মিনিট পাঁচেক পর আমরা ম্যামের সঙ্গে গ্রন্থ জাদুঘরে প্রবেশ করি।

বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘরটি দেশের প্রথম ও একমাত্র গ্রন্থ জাদুঘর। জাদুঘরটি স্থাপিত হয় ২০১৬ সালে। উনিশ শতকে স্থাপিত কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর ভবনটি। আমাদের দেখানো হয় তালপাতায় লেখা বইয়ের স্মৃতিচিহ্ন, হাতে লেখা ও কাঠ খোদা করা বই, বাংলাদেশের প্রথম হস্তলিখিত সংবিধানের রেপ্লিকা।

জাদুঘরটির সংগ্রহে রয়েছে কালী প্রসন্ন সিং সম্পাদিত মহাভারত গ্রন্থ। আরো আছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রাচীন পুঁথির বিবরণ, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, প্রাচীন ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গবেষণামূলক বই। বাংলায় যারা লেখেন প্রায় সবারই রচনাবলি-রচনাসমগ্র রয়েছে গ্রন্থ জাদুঘরে। বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্যের গ্রন্থ ভাণ্ডার বলা যেতে পারে এই গ্রন্থ জাদুঘরকে। যার প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনায় জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনি হলেন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। বঙ্গীয় গ্রন্থ জাদুঘর গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান। কেউ যদি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে এখানকার বই পড়তে চায়, তবে তাকে জাদুঘরের নিবন্ধিত ফেলো হতে হবে। জাদুঘরটির গবেষণা পত্রিকা 'পথরেখা'।

জাদুঘর দর্শনের পর আমরা ঘুরে দেখি কনকসার গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী বিশাল এক দিঘি। রাজা হরিশ্চন্দ্রের দিঘি, সুখবাসপুর কিংবা মধ্যপাড়া দিঘির মত এই দিঘিটিও বিক্রমপুর এলাকার ঐতিহ্য। দিঘির বিশালতা প্রকৃতিপ্রেমী ও ভাবুক হৃদয়ের মানুষদের আলাদা গল্প বুনতে সাহায্য করবে। সেই গল্পে বাড়তি উপকরণ হবে দিঘির কোলে গড়ে তোলা অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় 'পানকৌড়ি'। যার স্থাপত্যশৈলী একান্তই বিক্রমপুরের বাড়িঘরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গড়া। আমাদের বাড়তি পাওয়া ছিল সেখানকার আপ্যায়ন, যা মনে রাখার মত।
কনকসার দিঘি, পানকৌড়ি ভবন এবং আব্দুল জব্বার খান উন্মুক্ত মঞ্চ ঘুরে আমরা দুই বন্ধু বেড়িয়ে পড়ি মাওয়ার উদ্দেশ্যে। পরের গন্তব্য পদ্মাসেতু প্রাণী জাদুঘর। বেলা সাড়ে বারোটায় মাওয়া চৌরাস্তা থেকে কিছুদূর উত্তরে দোগাছিতে চলে যাই, পদ্মাসেতু উত্তর থানার ঠিক পাশে প্রাণী জাদুঘরটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এই জাদুঘরে এরই মধ্য স্থান পেয়েছে ১৪১৯ প্রজাতির ২১২৮ প্রাণীসহ ২৩৫৬টি নমুনা। পদ্মাসেতু ঘিরে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিকর প্রভাবমুক্ত রাখতে পুরো এলাকা সুরক্ষায় জলাভূমির বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বংশবৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা সেতু বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রাণী জাদুঘরটিতে প্রায় পাঁচ হাজার নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাণীগুলোকে এমনভাবে রাখা হয়েছে যা দেখে জীবন্ত মনে হবে। এই জাদুঘর দর্শনে যে কারো মন ভরে যাবে। কর্তৃপক্ষ বলেন, দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এই প্রাণী জাদুঘর শুধু বিনোদনই নয়, বরং গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে গড়ে তোলা এই জাদুঘরে দুর্লভ প্রাণীও স্থান পেয়েছে। তবে জাদুঘরটিতে কাজ চলমান থাকায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত।
এবার আমাদের যাত্রাপথ মাওয়া পুরাতন ঘাট হয়ে পদ্মানদীর তীরে, সেখান থেকে খরস্রোতা পদ্মার শুষ্ক রুপ দেখতে দেখতে চলে যাওয়া যায় অনেকদূর। নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে যেতে লাগলাম পদ্মাসেতুর দিকে। একপাশে রুপালি পদ্মার অপরুপ সৌন্দর্য, অপর পাশে চিরসবুজ গ্রামবাংলা। মাঝখানে শুভ্র বালির ঢিবিগুলো অনেকটা মরুভূমির মতো লাগছিলো। দুপুরের কড়া রোদের আলো যখন বালিতে মিশে চিকচিক করছিলো, সেই মনোলোভা দৃশ্য সত্যিই অপূর্ব। সেতুর দিকে চলছে নদীশাসনের মহা কর্মযজ্ঞ। এ খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সাথে মিশে আমরা চলে গেলাম পদ্মাসেতুর একদম কাছে। পদ্মাসেতু আর নদী দেখতে দেখতে কখন যে সময় চলে গেলো তার ইয়ত্তা নেই।
বেলা দু'টা বেজে বিশ মিনিট। আমাদের পেট ক্ষুধায় চো-চো করছে। যেহেতু পদ্মার ইলিশের জন্য মাওয়া ঘাট বিখ্যাত, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখানে তাই ইলিশ খেতে আসেন ভোজন রসিক মানুষেরা। বর্তমানে মাওয়ায় গড়ে ওঠেছে ছোট-বড় হোটেল ও রেস্তোরাঁ। আমরা সরষের তেলে ভাজা ইলিশ দিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম একটুও দেরি না করে। অতঃপর মাওয়া চৌরাস্তা থেকে অটোরিকশায় উঠে যাই শ্রীনগরের প্রাচীন জনপদ ভাগ্যকুল বাজারে যাব বলে।
পদ্মার একদম পাড় ঘেঁষে ছোট্ট এই ভাগ্যকুল বাজার। বাজারের এক পরিচিত দোকান গোবিন্দ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। এখানকার ঘোল খাওয়া আমার আগে একবার হয়েছিলো, সেই স্বাদ আমাকে আবারো টেনে নিয়ে এসেছে! দোকানে গিয়ে বসে অর্ডার করলাম। দুই মিনিটের মধ্যেই চলে এলো ঘোলের গ্লাস। এক টুকরা লেবু ভাসছে ঘোলের উপর। চুমুক দিতেই মন মাতানো লেবুর ঘ্রাণ এবং টক-মিষ্টি স্বাদে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। যাবতীয় ক্লান্তি নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। ভাগ্যকুলের ঘোলের সুনাম রয়েছে দূরদূরান্ত পর্যন্ত। খাওয়া শেষ করে এক বোতল ব্যাগে ভরে নিলাম বাড়ির জন্য।
এবার আমাদের বিশ্রামের পালা। অবকাশ যাপনের জন্য বালাসুরের রাজা যদুনাথ রায়ের বাড়ির আঙ্গিনা থেকে ভালো আর কি হতে পারে! ভাগ্যকুল থেকে মিনিট দশের দূরত্ব। রিক্সায় উঠে চলে গেলাম সেই জমিদারবাড়িতে। সবুজে ঘেরা ছিমছাম ছায়াশীতল বালাসুর গ্রামখানি বিক্রমপুরের অন্যতম মায়াময় গ্রাম। জমিদার বাড়ির চারিপাশ সবুজ গাছগাছালিতে ছাওয়া। বাড়ির দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল দুটি পুকুর। শানবাঁধানো ঘাটও আছে। আমরা পুকুরপাড়ে সবুজ ঘাসে পা ছড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দেই এবং বাচ্চাদের ফুটবল খেলা উপভোগ করি। পুকুরপাড়েই গড়ে তোলা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘর। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশের উদ্যোগে এই বিক্রমপুর জাদুঘর ও নৌকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। বিক্রমপুরে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সংগ্রহ করা অন্যান্য নিদর্শন দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘরটি।
আমাদের ঐতিহ্য ভ্রমণের শেষ পর্ব এই জাদুঘর। তিনতলা ভবনের জাদুঘরে প্রবেশ করতেই দুই পাশে দুটি বড় মটকি দেখি।

ছোটবেলায় আমাদের বাড়িতেও এ ধরনের মটকি ছিল। নিচতলার গ্যালারিতে বিক্রমপুরের প্রাচীন মানচিত্র, রঘুরামপুর, নাটেশ্বর, আমাদের সুজানগরসহ বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাওয়া পোড়া মাটির নল, মাটির পাত্র, পোড়ামাটির খেলনাসহ প্রত্নতাত্ত্বিকক বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। এছাড়া ব্যাসাল্ট পাথরের বাটি, গামলা, পাথরের থালা, পোড়া মাটির ইট, টালি ইত্যাদির সংগ্রহ প্রাচীন বিক্রমপুর সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেয়। দ্বিতীয় তলার রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি, ইতিহাস, দলিল, বই ও বিভিন্ন নমুনা। আছে বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া মনীষীদের জীবন ও কর্মের বৃত্তান্ত। জাদুঘরটিতে আরও আছে কাগজ আবিষ্কারের আগে যে ভূর্জ গাছের বাকলে লেখা হতো গাছের বাকল, তালপাতায় লেখা পুঁথি, কাঠের সিন্দুক, আদি আমলের মুদ্রা, তাঁতের চরকা, পোড়ামাটির মূর্তি, সিরামিকের থালাসহ প্রাচীন আমলে স্থানীয় মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন নিদর্শন। এই জাদুঘর দর্শনে আমরা আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে সহজেই উপলব্ধি করতে পারি।



এবার আমাদের ফেরার পালা। সারাদিনের ভ্রমণে ছুয়ে দেখা ঐতিহ্যের আত্মীয়তা গায়ে মেখে বাড়িতে ফেরার সময় ভাবতেছি, যদিও বিক্রমপুর নামে কিছু নেই মানচিত্রে, তথাপি ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে উপমহাদেশের একসময়ের সমৃদ্ধ এই জনপদ হয়ত আবার আলোকিত বিক্রমপুর হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। সেজন্য দরকার কেবল নতুন প্রজন্মকে বিক্রমপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলা।
লেখক: প্রতিনিধি, ঝিকুটপত্র।