
তিক্ত কথা; জীবনের চিত্রখানি
মুহিব বিন ইসহাক
সুদর্শন শব্দটি মোটামুটি সবারই পছন্দের। আমরা কথায় কথায় কোন যুবক- যুবতীর রূপের বর্ণনা দিতে প্রায়ই ব্যবহার করি। একথাও একমত হবেন হয়তো সবাই যে, এই রূপ পরিমাপের মানদণ্ড কেবলই বাহ্যিক সৌন্দর্য। কারো চেহারা সুন্দর মানেই সে সুদর্শন অথবা কারো দৈহিক কাঠামো বেশ পরিপাটি মানেই সে সুদর্শন! কারো গায়ের চর্ম বেশ ফর্সা হলে তো তার মর্যাদা সমাজে প্রথম শ্রেণির।
আমরা গোড়াতেই গুরুতর ভুল করে বসি। মানুষ বাছাই করতে, সঙ্গী নির্বাচন করতে গিয়ে প্রথমেই যা দেখি বা বিচার করি, তা শুধু ওই বাইরের আবরণ মাত্র। আচ্ছা আপনারা কত ফল খেয়েছেন এবং দেখেছেনও, তাই না? ছোটবেলায় কত আমই না কুড়িয়েছি! সেই কালবোশেখির ঝড়ে, বড় আম গাছটি থেকে যখন বড় বড় আম তলায় পড়ে থাকতো। দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে আনতাম। কত প্রতিযোগিতা চলতো, সমবয়সীদের সাথে! কিন্তু আশ্চর্য হতাম, উপরে কত পরিপাটি সেই আমের ভিতরটা পোকায় ভরা। এমনকি দু’একটা খাওয়ারও অযোগ্য হতো।
স্বভাব কবি মোজাম্মেল হকের একটি কবিতা পড়েছিলাম। বড় ভাইকেও খুব পড়তে শুনেছি। কবিতাটির কয়েকটি লাইন ঠিক এমনই:
‘মাকাল ফলটা হিঙুল বরণ
দেখতে বড়ই চমৎকার,
অন্তরে তার পুরিশপোরা
বধবো সহে সাধ্য কার!’
চরণগুলো তখন বিশ্লেষণ করতে না পারলেও, বয়সের পরিপক্বতায় বুঝতে পেরেছি এর বিষয়বস্তু। যেকোনো ফলের ব্যাপারেই সূত্রটি যথাযথ প্রয়োগ করা যাবে।
আম, লিচু, পেয়ারা…সবাই যত দেখেছি কিংবা খেয়েছি, তারও চেয়ে বেশি চিনতে হয় আমাদের চারপাশের মানুষগুলো। কখনও দূর থেকে কাউকে খুঁজে নিতে হয়, আপন করতে হয়। অথচ সেই জীবনের বাস্তব বেলায় এসে পড়ি খুব ধাঁধায়। বাহ্যিক অবকাঠামোয় ভুলে, কথিত সেই মাকালকেই পছন্দ করে ফেলি। এবং আমাদের আপন যে হয়ে ওঠে, বুঝতেও পারি না, এক সময় দুর্বিষহ দুর্গন্ধ ছড়িয়ে জীবনটা তছনছ করে দেয়। তাকে আর মূলে ফিরিয়ে আনা যায় না।
ধরুন, পাশাপাশি দুটো বৃক্ষ। তারা একই বয়সের। একই সাথে বেড়ে উঠেছে। ফল ধরার মৌসুমে দেখা গেলো, একটি বৃক্ষ ফুলে পরিপূর্ণ, কিছুদিন পর তাতে ফলও ধরেছে। আর বাকিটা শুধু তার তাজা-সবুজ পত্র পল্লবে ঘিরে, সুদর্শন এক যুবক/যুবতীর ন্যায় বাতাসে কেশ উড়াচ্ছে।
ফলবান বৃক্ষের দেহ, ফলের ভারে নুয়ে পড়লো। একসময় তার সবুজ পত্র আর বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকলো না, বৃক্ষের মালিক এখন পুরো নজরই দিচ্ছে তার পরিপক্ব ফলের দিকে। এরই সাথে বৃক্ষটার ফলবান হওয়ার অপরাধে (সমাজে পরোপকারীর দণ্ড সবাই পায়), কত দুষ্ট ছেলেদের ঢিল ছোড়া থেকে শুরু পাতা ছেড়া, ডাল ভাঙার কষ্ট নিয়মিত সহ্য করতে হয়। ফল পাকে, সবাই আপন মনে খায়। অবশেষে কী দেখি- ফলের সাথে সমস্ত পাতা ও ডালগুলোর ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন। কয়েকটি শাখা আর অবশিষ্ট বাকল নিয়ে জীবনটা বাঁচিয়েই সে খুশি। খুশি কারণ, বৃক্ষটিরও হয়তো, কামিনী রায়ের সুখ কবিতাটি জানা আছে…
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ,
‘সুখ-সুখ’ করি কেঁদো না আর;
যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
(-সুখ; কামিনী রায়)
কী বুঝলেন, এত বকবকানি শুনে কিংবা পড়ে! যে যুবকের মানুষ হওয়ার জন্য, ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতার-‘ ‘মানুষ হইতে হবে’- শিক্ষাকে জীবনের বাস্তব পাঠে শিখনফল ফলানোর জন্য, সমস্ত আরাম- আয়েশ বিসর্জন দিয়ে, সুন্দর অবয়বটা হেলায় মলিন করলো, তার কোন মর্যাদা কি নেই? তবে কি ফলহীন বৃক্ষের মতো, স্বার্থপরের মতো, নিজের বাহ্যিক ত্বকের যত্ন করা যুবক আর যুবতরাও পৃথিবীতে বেশি লাভবান হবে? হচ্ছেই তো- দেখছি দিন-রাত, এই মাকাল ফলের কারবার। জীবনের বাস্তব চিত্র, অসম ছবি- জুয়া খেলা।
লেখক: শিক্ষক ও কবি।