একটি শিশুর জীবনে শিক্ষিত মায়ের গুরুত্ব সবচাইতে বেশি। জন্মের পর তার পরিচর্যা থেকে শুরু করে তাকে মানুষ করার বেশির ভাগ দায়িত্ব মায়ের।
শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে, জীবনে গতি আনে, নতুন পথ দেখিয়ে জীবন গড়তে সহায়তা করে। সন্তান জন্মের পর সে একেবারেই কাদামাটির মতো থাকে, তাকে নৈতিক শিক্ষা দিয়ে গড়ে উঠতে সাহায্য করতে হয়। সন্তান গড়ে তোলার জন্য জ্ঞান অর্জন আবশ্যক, যা তাকে সঠিক পথ দেখাতে সাহায্য করে। মায়ের মন অত্যন্ত কোমল প্রকৃতির যা সন্তানকে আকৃষ্ট করে। মায়া-মমতায় ঘিরে সন্তানকে মাতা-পিতা এগিয়ে যেতে পথ দেখায়। একজন শিক্ষিত মা-ই পারে তার সন্তানের সুপ্ত মনোবৃত্তির বিকাশ ঘটাতে। তা ছাড়া জন্মগতভাবে সন্তান মায়ের প্রতি দুর্বল থাকে, যা তাকে মায়ের চিন্তা-চেতনায় প্রভাবিত করে।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, অশিক্ষিত মায়েরা অজ্ঞতার কারণে সন্তানের জীবন গঠনে খুব একটা সহায়তা করতে পারে না। তখন বেশির ভাগ সময়ই সন্তান অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষিত মায়েদের সন্তান স্বাভাব-চরিত্রে, শিক্ষায়, ভদ্রতা-নম্রতায় আদর্শবান হয়। যে দেশের মেয়েরা শিক্ষা-দীক্ষায় যত উন্নত সে দেশের জনগণও সর্বক্ষেত্রে উন্নত ও সে জাতিই বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অগ্রগামী।
শিশুর জন্মগ্রহণের পর ৪-৫ বছর সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করে তার মায়ের সাথে। মায়ের সাহচর্যে শিশু দিনে দিনে বড় হয়। আস্তে আস্তে নড়াচড়া, হামাগুড়ি দেয়া, কথা বলা থেকে শুরু করে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শেখে। এক সময় তাকে সমাজের নিয়ম-কানুন মেনে বড়ো হতে হয়। এই সময় তার আশপাশের বড়দের ভূমিকা জীবন গড়তে অপরিহার্য। বড় ভাই-বোন, খেলার সাথী, পাড়া প্রতিবেশী, মা-বাবা, আত্মীয় স্বজন থেকে শুরু করে সকলের কাছে তার শিক্ষা গ্রহণ শুরু হয়। ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা না থাকায় সে যাই দেখে সেটা শিখতে চেষ্টা করে। অভিভাবকহীন শিশুরা সঠিক দিক-নির্দেশনার অভাবে ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারে না। তাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, যা পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। সব ক্ষেত্রেই মায়ের উপস্থিতি শিশুর জীবনে পূর্ণতা আনে যদি সে মা সুশিক্ষিত হয়।
আমরা বয়সের সাথে দিনে দিনে বড় হই। প্রকৃত বড় হওয়া আর বেড়ে ওঠা দুটি ভিন্ন বিষয়। আদর্শ মানুষ হিসেবে বড় হতে চাই উপযুক্ত শিক্ষা। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মানুষের শিক্ষার স্থান একথা সত্য কিন্তু জীবনের শুরুতে শিশু বয়সের শিক্ষার বিষয়টি মানুষের জীবনের ভিত্তি হিসেবে মুখ্য ভূমিকা রাখে যা পরবর্তী জীবনকে প্রস্ফুটিত করে। আর এই গুরু দায়িত্ব পালন করেন একজন মা। জীবন গড়তে মায়ের ভূমিকা লিখে শেষ করা যাবে না। আমরা যারা জীবনের সব স্তর পেরিয়ে এসেছি তাদের কাছে বিষয়টি স্বচ্ছ। মা-বাবার অবদান কখনো পরিশোধযোগ্য নয়।
শিশুকে গড়ে তুলতে যিনি নিজের অজান্তেই দায়িত্ব কাঁধে নেন তার শিক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই উন্নত জাতি গড়তে মা যাতে উপযুক্ত শিক্ষিত হন সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি এ সুযোগ আরও বৃদ্ধি করে কিভাবে আদর্শ মা হতে পারে তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানাই।
আমরা নারীদের শিক্ষিত করে তুলতে অবদান রাখতে পারি। ইভ-টিজিং বন্ধে আরো সোচ্চার হতে পারি, সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারি। দেশের উন্নয়নে ছোটো-বড়ো সবারই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই আমাদের সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। শিক্ষিত উন্নত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই বিশ্ব দরবারে। নারীকে শিক্ষিত হতে একান্তভাবে সচেষ্ট হতে হবে। তার জন্য সরকারের পাশাপাশি সবার সাহায্যের হাতে বাড়িয়ে দিতে হবে, তাহলেই উন্নয়ন জাতি গঠন সম্ভব।
নেপোলিয়ান বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দিব” । এই কথাটির তাৎপর্য ব্যাপক।
আজকের যুগের শিক্ষিত মায়ের প্রয়োজন সর্বক্ষেত্রে। শিক্ষা হলো একটি আলোর মতো যা সর্বক্ষেত্রেই দ্যুতি ছড়াতে পারে।
আমরা জানি পরিবার হচ্ছে একটি সমাজের প্রাথমিক ভিত্তি যেখান থেকে তৈরি হওয়া এক একটি আলোকিত মানুষ এক একটি ইটের মতো একত্রিত হয়ে তৈরি করতে পারে একটি আলোকিত সমাজের ইমারত।
আর এই পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় একজন শিক্ষিত মা তবে সেই পরিবারে র সুসন্তানেরা একটি আদর্শ সমাজ গঠনে ইতি বাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সুসন্তান তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া,অনেকটা বীজকে বৃক্ষে পরিণত করার মত। বীজ বপনের পর থেকেই যেমন তার পরিচর্যা শুরু করতে হয় তেমনি একজন সুস্থ সন্তান পাওয়ার জন্য সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই তার প্রতি যত্নশীল হওয়া দরকার।
আর এ ক্ষেত্রে একজন মা যদি তার শিক্ষিত হওয়ার সুবিধাকে কাজে লাগায় যেমন, গর্ভাবস্থায় কোন ধরনের খাবার খাওয়া দরকার, কতবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার, চলাফেরার ব্যাপারে কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার প্রভৃতি বিষয়ে বই , ম্যাগাজিন পড়ে কিংবা ইন্টার নেট থেকে তথ্য নিয়ে সে নিজের প্রতি সচেতন হয় তবে সে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারে।
একইভাবে সন্তান জন্মের পর থেকে তাকে ছয় মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানো, ছয় মাস পর থেকে কি ধরনের খাবার খাওয়ালে, কিভাবে প্রতিপালন করলে তার শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় ধরনের বিকাশ ঘটবে তা জানা ও মানার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষিত মায়ের ভূমিকা হতে পারে অগ্রগণ্য।
এরপর সন্তান যখন কথা বলতে শেখে তখন তার মুখের ভাষা কেমন হবে, কথা বলার সময় তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি কেমন হবে, বিভিন্ন বয়সী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষের সাথে তার ব্যবহারের ভিন্নতা কেমন হবে, এমনকি পোশাক নির্বাচন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে তার রুচি কেমন হবে –এসব কিছুর মধ্যেই মা তার শিক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারে তার সন্তানের মাঝে ।
সন্তানের যখন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয় তখন একজন শিক্ষিত মা যদি নিজে তার সন্তানকে পড়ান ,অন্তত প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পড়িয়ে তার বেসিক তৈরি করে দেন তবে সেই ভিত্তি হয় অনেক মজবুত।
কারণ একজন মা যতটা আন্তরিকতা নিয়ে বিশদভাবে পড়াতে পারেন , অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আসা একজন গৃহশিক্ষকের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাছাড়া মা নিজে পড়ালে তিনি তার সন্তানের দুর্বলতা কিংবা আগ্রহের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পারেন যা পরবর্তীতে সন্তানের উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে লাগে।
একটা পর্যায়ে গিয়ে হয়ত সব শিক্ষিত মায়ের পক্ষেই সন্তানকে নিজে পড়ানো সম্ভব হয় না, যেহেতু শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। কিন্তু তখনও যদি একজন মা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সন্তানের উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে নিজেও অন্তত মনিটরিং এ রাখেন তবে সন্তান লক্ষ্যচ্যুত হতে পারে না ।
এরপর সন্তান যখন আরও বড় হয় তখন তার পরিচিতের পরিধি বিস্তৃত হয়, জীবন সম্পর্কে নিজস্ব মতামত তৈরি হয় । শুধু “জন্মদাত্রী মা বলেই সারা জীবন তাকে গাইড করার অধিকার আছে ”– এই মনোভাব নিয়ে তখন আর সন্তান কে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না ।
“মা তোমার চেয়ে আগে পৃথিবীতে এসেছে বলে সে তোমার চেয়ে বেশী জানে কিংবা মা যা বলে সন্তানের মঙ্গলের জন্যই বলে”— এই জাতীয় কথা তখন অনেক সন্তানের কাছেই আবেগতাড়িত বাক্য মনে হয় , বাস্তবে গুরুত্ব পায় না ।
তাই এই পর্যায়ে এসে সন্তানের সাথে যেন দূরত্ব তৈরি না হয় সেক্ষেত্রেও শিক্ষাই পারে একজন মাকে সহায়তা করতে। একজন মা যদি প্রতিদিন পত্রিকা পড়ে, অনলাইনের জগৎ, সাম্প্রতিক টেকনোলজি, চলতি বিশ্বের প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে আপডেট থাকেন অর্থ্যাৎ রাজনীতি ,অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন, বিজ্ঞান, প্রভৃতি বিষয়ে কোন ট্রেন্ড চলছে তা সম্পর্কে অবগত থাকেন তখন কিন্তু সন্তান তাকে আর ব্যাকডেটেড বলে দূরে সরিয়ে রাখে না।
একজন কলেজ বা ভার্সিটি পড়ুয়া সন্তান তার বন্ধুদের সাথে যে বিষয়ে আড্ডা দিতে পারে সে বিষয় গুলো যখন সে মায়ের সাথেও শেয়ার করতে পারে তখন অনেক বন্ধুদেরর ভীড়েও “মা”ই থাকে তার “বেস্ট ফ্রেন্ড”। জীবনের যে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে সে তার মায়ের সাথে আলোচনা করে ।
এভাবে একজন শিক্ষিত মায়ের সার্বিক তত্বাবধানে বেড়ে ওঠা একজন সন্তানের ইয়াবার নেশায় আসক্ত হয়ে অপরাধমূলক কাজ করা, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করা কিংবা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে জঙ্গী প্রশিক্ষণ নেয়ার মতো ক্ষতিকর কাজ করার সম্ভাবনা থাকে অনেক কম ।
“প্রতিটি মানুষেরই যে সমাজের প্রতি ভালো কিছু করার দায়বদ্ধতা আছে ”–এই বোধ একজন সন্তানকে সুসন্তানে পরিণত করে।আর এর কৃতিত্ব একজন শিক্ষিত মায়ের।
আরও পড়ুন : ভূতের রাজ্য
তাই আমার মতামত শিক্ষা ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেয়ার পরও পারিবারিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে চাকরী করতে পারছেন না বলে যেসব মায়েরা হতাশায় ভুগছেন তাদের প্রতি আমার আহ্বান , “এত লেখাপড়া শিখেও জীবনে কিছুই করতে পারলাম না” বলে হীনমন্যতায় না ভুগে আপনারা আপনাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে এক একজন আদর্শবান সুসন্তান গড়ে তুলুন।
যারা সমাজের আলোক বর্তিকা হিসেবে কাজ করবে আর সেই সাথে এটাও প্রমাণ করুন যে, শিক্ষা মানে শুধু ডিগ্রী বা সার্টিফিকেট নয় বরং শিক্ষা মানে হলো “ আলো “ যা সমাজের অন্ধকার দূর করতে শিক্ষারূপী আলোর ভূমিকা চিরন্তন ও অনস্বীকার্য।তাই সর্বশেষে বলা যায় যে সুসন্তান তৈরিতে, আলোকিত মানুষ তৈরিতে, আদর্শ এবং উন্নত জাতি গঠনে শিক্ষিত মায়ের ভূমিকা ব্যাপক।
লেখক : অর্থ সম্পাদক, ঝিকুট ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় পরিষদ।