
ক্ষমতার প্রয়োগ, অপব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে যৌনতার সম্পর্ক
স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অবদমন করে মানুষ যখন আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে, তখনই প্রয়োজন পড়ে নিজের মস্তিষ্ককে সচেতনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার। একটা ছোট উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝা যাক। আসুন দুটো ছোট ছোট ঘটনা কল্পনা করি..
ধরুন আপনি কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে বসে আছেন। সকাল সকাল আপনার মা ময়লার সাথে আপনাকেও ঝাড়ু দিয়ে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। গতকাল সারারাত খেলা দেখে ঘুমের বারোটা বাজিয়েছেন তাই আপনি এখন ক্লাসরুমে বসেই ঘুমাচ্ছেন। কখন শিক্ষক এসেছে সে সম্পর্কে আপনার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। এবং আপনার সুখনিদ্রার মাঝে হঠাৎ… ঠাসসসস!!
শরীরভর্তি জেদ নিয়ে পিঠ ডলতে ডলতে আপনি বুঝতে পারলেন আপনার কিছুই করার নেই। মন খারাপ করে বাসায় ফিরে দেখলেন খাবার রান্না হয়নি। এবার মায়ের সাথে চিল্লানো-টা একটু বেশী ই হয়ে গেলো । আপনি পরে বুঝতে পারলেন, কাজটা আসলে ঠিক হয়নি।
পরদিন আবার খেলা দেখে ফিরলেন, ক্লাসে বসে ঘুমাচ্ছেন। পেছন থেকে আবার… ঠাসসস!!
উঠে দেখলেন পিছনে আপনার বন্ধু দুই পাটি দাঁত বের করে আপনার দিকে তাকিয়ে আছে।
তাকে “খা******** পোলা”, “মাদা**********” সহ বেশ কিছু গালাগাল দেওয়ার পর বুঝতে পারলেন এখন কিছুটা ভালো লাগছে। সেদিনও বাসায় গিয়ে দেখলেন বিধি বাম। আজও রান্না হয়নি।
আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, বন্ধুকে গালাগাল দেওয়ার পর বাসায় গিয়ে খাবারের জন্য আপনি আর গতদিনের মতো ততটা চেচামেচি করবেন না। সাইকোলজির ভাষায় একে বলে Psychological Displacement আর প্রবাদে আমরা যাকে বলি ওই “ওলার বিষ খোলায় ঢালা” আরকি।
এবার এক্টুবক্ষমতায়নের ধারণায় আসি। যৌনতার সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক আসলেই ফুকো কাকুকে টেনে আনার প্রয়োজন পরে। ফুকো ভিক্টোরিয়ান পূর্ব যৌনতার ধারণা আলোচনা করেছেন। এই সময়টায় যৌনতার আলোচনা নিষিদ্ধ করা পর থেকেই মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিক যৌনতার আগ্রহ বেড়ে যেতে থাকে এবং সেই যৌনতার অবদমনের ফল হিসেবে দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে স্বাভাবিকতা ঠিক রাখা কষ্টকর হয়ে যায়। বিষয়টি কিভাবে হচ্ছে সেটা আলোচনা করার পূর্বে ক্ষমতার সাথে এর সম্পর্ক সহজ করে আলোচনা করার চেষ্টা করি একটু,
আপনার বাবা আপনাকে বলেছেন, এইচ এস সি তে জিপিএ ফাইভ পেলে আমি তোমাকে ফোন কিনে দিবো। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে বললো একটা ফোন তো আপনার খুবই প্রয়োজন। আপনি যথারীতি জিপিএ ফাইভ আনার চেষ্টায় লেগে গেলেন।
এই ঘটনার পরদিনই আপনার বন্ধু বললো, “চল একটু ঘুরতে যাই।” অনেক চেষ্টা থাকা সত্বেও আপনি না করলেন কারণ আপনার পড়তে বসতে হবে।
এখান থেকে একটা বিষয় খুবই পরিষ্কার যে, ঘুরতে যাওয়াকে আপনার মস্তিষ্ক সায় দেয়নি কারণ আপনার মনে হয়েছে ফোনটা আপনার বেশি দরকার। তাই আপনাকে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে।
এখানে যে বিষয়টা সহজলভ্য, সেটা হচ্ছে আপনার প্রয়োজন পূরনের আশ্বাস আপনাকে কাজের প্রেষণা দিবে। যেহেতু ফোন কেনার জন্য আপনাকে আপনার বাবার উপর নির্ভরশীল হতে হবে, তাই আপনি কাজ করে শর্ত পূরন করার চেষ্টা করবেন, এটা হওয়াটা-ই স্বাভাবিক।
এবার ধরুন কেউ যদি এভাবেই আপনার খাবার নিয়ন্ত্রণ করে? এবং আপনাকে বলে যে আপনি আট ঘন্টার পরিবর্তে বারো ঘন্টা কাজ করলে খাবার পাবেন।
কিছুক্ষণের জন্য হয়তো আপনি মনে করবেন, খাবার লাগবে না আর এই কাজ ও করবো না। কিন্তু কিছুক্ষনের মাঝেই আপনি টের পাবেন খুবই অবাস্তব হয়ে গেছে চিন্তাটা। আপনি যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ও নেন কাজ করবেন না সেক্ষেত্রে আপনার শরীর আপনার নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করবে।

লেখকের প্রকাশিত বই।
ঠিক একইভাবে যৌনতার ধারণা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে পুঁজিকরণ করা হয়েছে এবং তাকে ক্ষমতায়নে রুপান্তরিত করা হয়েছে। যদিও, ক্ষমতার চেহারা, প্রকৃতি, উদ্দেশ্য যুগে যুগে পাল্টায়। এই ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে নতুন নতুন শাখা প্রশাখার উদ্ভব ঘটে। আগে শাখা প্রশাখা না আগে ক্ষমতা — এভাবে কালানুক্রমিক পরম্পরা নয়, বরং ভাবতে হবে শাখা প্রশাখা বিস্তার এবং ক্ষমতা রূপান্তর একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এখানে জৈবরাজনৈতিক ক্ষমতা মানুষের আচরণকে “নিয়ন্ত্রণ” করে, এ কথা বলার পরিবর্তে তাদের আচরণকে “গড়ে তোলে” এভাবে বলতেই আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ, জৈবরাজনৈতিক ক্ষমতা বাইরে থেকে নয় বরং ভেতর থেকেই কার্যকর হয়ে ওঠে । রায়হান শফিক সাহেবের একটা সুন্দর লিখা আছে, “ব্যাক্তি, যৌনতা, প্রতিরোধ ও অন্যান্য প্রসংগ।” ,এছাড়া ফুকোর ক্ষমতা প্রসঙ্গে সাধারণ ধারণায়ন চাইলে পড়তে পারেন।
যাইহোক, এবার ক্ষমতা ব্যবহার প্রসঙ্গে একটু আলোচনা করা যাক। আপনি বুঝতে শেখার পর থেকে সবথেকে বেশী সময় পার করেছেন শিক্ষকদের সাথে যারা সর্বপ্রথম আপনাকে বুঝায় ক্ষমতা কি। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে স্যার যখন মারত তখন আমাদের অনেক ছাত্রদের মধ্যেই এই কানাঘুষা ছিলো যে,” নিশ্চয়ই স্যার বউয়ের সাথে ঝগড়া করে আসছে”
পরে অবশ্য ঝগড়া করা কর্মের বিলুপ্তি ঘটিয়ে অন্য কর্মবাচক শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। উপরন্তু ধারণা থাক বা না থাক শিক্ষকের ক্ষমতা প্রদর্শনে তার বউ নিয়ে আলোচনা খুবই স্বাভাবিক ছিলো। এবং Psychological Displacement এর সাধারণ সংজ্ঞা অনুসারে আমাদের তখনকার কানাঘুষা একেবারে ফেলে দেওয়ার মত ও না…
যাইহোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতা থাকে মোটামুটি শিক্ষকদের দখলে একথা বললেও হয়তো খুব একটা ভূল বলা হবে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামান্য পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা এবং ক্ষুদ্র পড়াশুনা থেকে আমার অনুভূতি হচ্ছে, অযোগ্য লোকজনের মাঝে ক্ষমতার দম্ভ থাকে ভয়াবহ। যেহেতু আমার আলোচনার বিষয় ক্ষমতার প্রয়োগ, ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাই ক্ষমতা কাকে দাম্ভিক বা বিনয়ী করেছে তার পর্যালোচনায় যাচ্ছি না।
তবে যৌনতার সাথে ক্ষমতা ব্যবহারের দিক বিবেচনা করলে, ধরুন কোনো সরকারি অফিসে গিয়েছেন, আপনার দিকে তাকানো ও হলো না, বলে দেওয়া হলো
“যান যান, পরে আসেন, আমাদের কি কাজ নাই! আপনার ভূল নিয়া আমরা পইড়া থাকি!”
পুলিশ স্টেশন এ গেছেন, “না বলি, বেশী অফেনসিভ হয়…”
বাসে ছুটির দিনে চড়েছেন, ভাড়া বেশি, কন্ডাক্টর বলে ফেলল,”এই ভাড়ায় গেলে যান, না গেলে সরেন”
রাস্তায় বাইকাররা উগ্রভাবে বাইক চালাচ্ছে চালাচ্ছে, কিছু বলতে গেলেই বলে উঠলো,
“তর বাপের কি! হাটতে না পারলে বোরকা পিন্দা ঘরে বইয়া থাক”
পরীক্ষার আগে শিক্ষকের কাছে গেছেন, যখন তার কাছে কোনো যৌক্তিক ব্যখ্যা নাই তখন বললো, “আপনার মতামত দিতে চাইলে রিসার্চ করে আসেন (অথবা স্টাডি গাইডে যা আছে লিখেন)”
এমন সহস্রাধিক ঘটনা হয়তো আপনি দেখতে পাবেন আপনার প্রতিদিনের জীবনে। প্রতিটা ঘটনার-ই ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব কিন্তু অপব্যবহার-কে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হিসেবে ব্যখ্যা করলে এদের প্রত্যেকের ই যৌন জীবনের দিকে আংগুল তোলা যায়।
যদিও শেষ অব্দি প্রশ্ন থেকে ই যায়, অপব্যবহারকে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বলা যায় কি না। যদি যায়, তাহলে সমাধান নিয়ে কে বা কারা কি কি আলোচনা করেছেন। যদি না যায়, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার এর ব্যখ্যা আমরা কোন দর্শনের অনূকূল এ করবো…
লেখক: মারুফ বিল্লাহ
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ
সোনারগাঁও স্টার ফ্লাওয়ার এস আর স্কুল এন্ড কলেজ।