
অনভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তি, ভূয়া ও পোর্টাল সাংবাদিক, হিংসুটে সংগঠক, মাদক সেবী ও ব্যবসায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রভৃতি পেশার মানুষ।
১. হীনমন্যতা (Inferiority Complex):
কোনো আঘাতে বা পারিপ্বার্শিক কারণে হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়। এসব মানুষদের অনুভূতি এমন থাকে যখন কোনো ব্যক্তি, অন্য লোকেদের সামনে নিজেকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেন না, এবং তখন নিজের ভেতর নিজেকে ছোট ভাবার এই অবস্থা কাটিয়ে তুলতে, নিজের চারপাশেই একটা দেয়াল তুলে ধরেন। এই কাজটি কেন করেন তারা? যাতে আশেপাশের মানুষের কাছে, তার এই হীনমন্যতা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ধরা না পড়ে। এরা অন্যের ভুল খোঁজার চেষ্টায় থাকেন। সামাজিকভাবে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে। সব কাজে উদ্বেগ প্রকাশ করে। একারণেই তারা সমাজ সেবায় বাধা দেয়।
২. পরশ্রীকাতরতা (Malevolence):
সহযোগিতা আর প্রতিযোগিতা শব্দ দু’টির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। সহযোগিতা মানুষের অন্তর প্রশান্ত ও পুলকিত করে। সহযোগিতার উৎস হলো- নৈতিক মূল্যবোধ। আর প্রতিযোগিতা অন্তরকে বিষন্ন, অবসাদগ্রস্ত, অশান্ত, হিংস্র ও ভয়ংকর আগ্রাসী করে তুলে। প্রতিযোগিতা সুপ্ত হিংসাকেই জাগিয়ে তোলে, ভালোবাসাকে নয়। প্রতিযোগিতা প্রবণতা মূলত ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা থেকে তৈরি হয়।
বাঙালির কাঁকড়া নীতিবিষয়ক একটি গল্প উল্লেখ করেছিলেন বুদ্ধদেব গুহ। পরিচিত সহযাত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি তো অন্যদিন ড্রাম ঢেকে রাখেন। আজ ঢাকনা খোলা কেন? কাঁকড়া তো সব বেরিয়ে যাবে।’ জবাবে ব্যবসায়ী বললেন, ‘ঢাকনা খোলা থাকলেও এই কাঁকড়া বের হতে পারবে না।’ সহযাত্রী অবাক হয়ে বললেন, ‘কেন বের হতে পারবে না?’ ব্যবসায়ী হেসে উত্তর দিলেন, ‘এই কাঁকড়াগুলো বাঙাল মুল্লুকের। কোনো কাঁকড়া যদি ড্রাম থেকে বের হতে চায়, তা হলে স্বগোত্রীয় কাঁকড়াগুলো এর হাত, পা ধরে টানাটানি করে নিচে নামাবেই। কাঁকড়া যেখানে ছিল সেখানেই নামতে বাধ্য হবে। তাই এগুলোর বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’ গল্পটির মর্মার্থ পরিষ্কার। বাঙালি সে কাঁকড়াই হোক আর মানুষই হোক পরশ্রীকাতরতার হাত থেকে তার মুক্তি নেই। পরের শ্রী দেখে কাতর হওয়া বাঙালির মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য।
৩. ক্ষমতা (Power):
ক্ষমতা শব্দটি ক্ষেত্র বিশেষে শক্তি, সামর্থ্য বা দক্ষতাকে নির্দেশ করে।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী। অনেকটা খবরের মতো ক্ষণস্থায়ী। নতুন খবরের ভিড়ে পুরনো খবরটা যেমন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে, তেমনি ক্ষমতাও। অনলাইন পত্রিকার বেলায় যেমন, যে খবরটা একটু আগেও বক্স স্টোরি হয়েছিল, সেটাও নতুন আরেকটা তাজা খবরের ভিড়ে কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকল, তার খেয়াল কে রাখে। ক্ষমতাও এমনই ক্ষণস্থায়ী। এই একজনের হাতে আছে তো পরক্ষণেই অন্যের হাতে।
কিন্তু ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হয় কেন? খুঁজলে কারণটা মিলবে লর্ড অ্যাক্টনের ওই কথায়, ‘ক্ষমতা ধ্বংস ডেকে আনে। এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা ধ্বংস করে সমূলে।’
সর্বোপরি কথা হলো সমালোচকরা ভাবে স্বেচ্ছাসেবীরা সমাজকল্যাণ করলে তাদের ক্ষমতা বেড়ে যাবে।
৪. মূল্যায়ন (appreciation):
সঠিক জায়গায়, সঠিক লোক, সঠিক ভাবেই মূল্যায়ন করবে। কোথায়ও যদি কোন মূল্যবান মানুষকে মূল্যায়ন না করা হয় তবে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। বুঝে নিতে হবে আমরা ভুল জায়গায় আছি। মনে রাখতে হবে তারাই মূল্যায়ন করবে, মূল্য দিবে, যাদের মূল্যাবোধ আছে, গুণ ও গুনীর মর্ম উপলব্ধি করার মতো ক্ষমতা আছে। এমন জায়গায় যাওয়ার দরকার নাই যেখানে প্রকৃত মূল্যায়ন করার যোগ্য মানুষের বড্ড অভাব।
সুতরাং বিরোধীরা ভাবে তাদের চাইতে সমাজকর্মীদের মানুষ বেশি মূল্যায়ন করে। একারণে তারা বাধা দেয়।
৫. সততা (Honesty):
সততা মনুষ্যত্ব্যের বিকাশ ঘটায়। সততাই মানব জীবনে সফলতা ও আনন্দ বয়ে আনে। সততাই বড় সম্পদ। মানবচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ। জীবনে সততার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মহান আল্লাহ মানবসমাজকে যে সীমারেখায় চলতে নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে সততা অপরিহার্য।
মানবসমাজের নিরাপত্তা, সুখ-শান্তি, উন্নতির ভিত্তি হলো সততা। এ কারণেই সততাকে আপন করে নিতে গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম।
সততা থেকে আমরা কত পিছিয়ে। তাই সব সময় কথা ও কাজে সততা ও স্বচ্ছতার পরিচয় দেওয়া এবং মিথ্যার অভিশাপ গ্লানি থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। এতে দুনিয়া ও আখিরাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে উপযুক্ত বিনিময় মিলবে।
প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবী সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়। ফলে কুচক্রীরা বিরোধিতা করে।
৬. জনপ্রিয়তা (Popularity):
আমরা জনমত দ্বারা আচ্ছন্ন একটি সমাজে বাস করি। এখানে নেতৃত্ব কখনোই জনপ্রিয়তা পায়নি।
– মার্কো রুবিওো
জনপ্রিয়তা একটি বুদবুদ এবং এটি একটি পর্বত যেখানে উপরে উঠতে হয় খুব কষ্ট করে কিন্তু এক পলকেই নিচে নেমে যাওয়া যায়।
– এডমুন্ড বুরকে
স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ করা ফলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে সহজে। এটা বিরোধিতা করার অন্যতম কারণ।
আরও পড়ুন সফলতা
৭. সহযোগিতা (Help):
আমিও জিতব সেও জিতবে। আমার অগ্রযাত্রায় যেন অন্যের কোনো ক্ষতি না হয়। আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী বা যার প্রতি ঈর্ষা অনুভব করেন তার জন্যে দোয়া করুন। অন্যের সাফল্যে নিজের সাফল্যের মতোই আনন্দিত হোন।
ব্ল্যাকবোর্ডে একটি সরলরেখা টানলেন। তারপর বললেন, এবার আমি এটিকে ছোট করতে চাই। কিন্তু একে কেটে বা মুছে ছোট করা যাবে না। এখন বলো, কীভাবে এই কাজটা করতে পারি? বুদ্ধির খেলা, সন্দেহ নেই।
এটা মুছে দেয়ার দরকার ছিল না। এর পাশে যদি একটা বড় সরলরেখা টানো, তাহলে তো ওটা এমনিতেই ছোট হয়ে যায়! এটাই হলো সুস্থ প্রতিযোগিতা। যে জোরে দৌড়াতে পারে, ওকে পেছন থেকে টেনে ধরব না, ওর পথের মধ্যে এমন কিছু রাখব না, যাতে সে পড়ে যায়। আমাদের চিন্তাটা হওয়া উচিত এমন যে, সে দৌড়াচ্ছে দৌড়াক, তাকে থামানোর দরকার নেই, আগে যাওয়ার দরকার হলে একটু কষ্ট করে আমি ওর চেয়ে কিছুটা বেশি দৌড়াই। আরেকজন বড় হয়ে গেছে, তাকে কাটার দরকার নেই। স্রষ্টা আমার মধ্যে যে গুণ দিয়েছেন, আমি বরং সেটা কাজে লাগিয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা করি। এই প্রতিযোগিতাই পছন্দ করেন মহান স্রষ্টা।
তাই কাউকে কোনোদিন কোনোভাবে মুছে ছোট করতে যেও না। কারো কীর্তিকে ছোট করতে যেও না। তাকে বরং সাহায্য করো এই বলে যে, তুমি আরো বড় হও।
ধনী-গরিব মিলিয়েই মূলত একটি সমাজ। তাই বিভিন্ন সময়ে অসহায় দরিদ্রদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়ানো ধনী লোকদের নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান সমাজে পরস্পর সহযোগিতা ও কল্যাণ কামনার পরিবর্তে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সব স্তরে অন্যায় অত্যাচার ও জুলুমে ছেয়ে গেছে।
একাজটায় এগিয়ে আসে সমাজ সেবক। যার কারণে তাদের বিরোধিতা।
বর্তমান সমাজে পরস্পর সহযোগিতা ও কল্যাণ কামনার পরিবর্তে নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সব স্তরে অন্যায় অত্যাচার ও জুলুমে ছেয়ে গেছে।
ধনী-গরিব মিলিয়েই মূলত একটি সমাজ। সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে পরস্পরের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। তাই বিভিন্ন সময়ে অসহায় দরিদ্রদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়ানো ধনী লোকদের নৈতিক দায়িত্ব।
এ কাজটায় এগিয়ে আসেন সমাজ সেবক। যার কারণে তাদের বিরোধিতা।
লেখক: আশরাফ ইকবাল
শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগঠক।
© লেখক।