
মানুষ ও মনুষ্যত্ব
মুহিব বিন ইসহাক :
মানুষ সামাজিক জীব। তবে কি তা শুধু স্লোগানে! কেবলই কি বইয়ের পাতায় কিংবা এরিস্টটলের থিওরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ! নাকি তা সমকালীন বাস্তবতায় খাপছাড়া! বুঝতে পারি না, পারছি না।
সোশ্যাল জীব হিসেবে মানুষের কিছু কর্তব্য পালন করতেই হয়। মানব শিশু হয়ে জন্ম নিলেই কেউ সামাজিক জীব হয় না। একটা প্রাণীর সাথে মানুষের এখানেই ভেদ। সৃষ্টির সবজীবই জন্ম নিলেই তার সগোত্রে নাম লেখান, মানুষ তার ব্যতিক্রম। মানুষের মানুষ হয়ে উঠতে হয়। মানুষের জন্য তাই এত এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এত এত শিক্ষা ব্যবস্থা। এত ধর্ম, এত মতবাদ, এত দর্শন।
একটা সিংহ শাবক জন্মের পরেই সিংহ। একটা কুকুর ছানাও জন্মের পরেই কুকুর। কিন্তু যথাযথ মানবতার শিক্ষা না পেলে কিংবা পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের দীক্ষা ব্যতিরেকে কাউকে মানুষ বলা যায় কি! মানুষ? মহান আল্লাহ তায়ালা এদের কত সম্মান দিয়েছেন! সমস্ত সৃষ্টির সেরা বানিয়েছেন। কোন্ গুণের কারণে তারা সেরা? তা কি একবারও ভাবছে এ জাতি? নাকি মানুষ নয়, শুধু মানুষের বাহ্যিক রূপ নিয়েই, আরেকটু স্পষ্ট করে বললে, জৈব সত্তা নিয়েই মানুষ হয়ে আছে। পশু- পাখিরও জৈব সত্তা বিরাজমান এবং তা মানুষের চেয়ে আরও প্রবলতর। যদি বনের পশুর থেকে তারা আলাদা না হতে পারে, তবে তারা কি মানুষ!
ধরুন, একটা পুরুষ পশু তার স্ত্রী পশুটাকে জৈবিক চাহিদা পূরণে জোর করে আক্রমণ করছে। তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা মা-বাপ এসবের কোন হিসেব আদৌ নেই, এবং তা সৃষ্টিকর্তাও নির্ধারিত করেননি। কিন্তু একজন মানুষকে এসব ভাবতে হয়, হচ্ছে। মানুষ হয়ে উঠতে হয় তাকে। নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, যৌবনের। যারা পারে না, তারা খাঁটি অমানুষ অর্থাৎ বন্য পশু কিংবা আরও হীন কেসেমের!
আবার যারা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছেন, তাদেরও কোন কোন ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি কোন দায়বদ্ধতা দেখতে পাই না। কেবল আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যারা জীবন পার করতে ভালবাসেন, তাদের নিয়েও কিছু বলার আছে। আপনি বড় সাধু। বড় মানুষ। বড় কর্তা। আপনার অধীনস্ত অনেকেই। আপনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। তাই বলে নিজের সুখটা খুঁজে, পাশ কেটে থাকবেন! এমন কেটে কেটে চলতে গিয়ে, সংকীর্ণতার বেড়াজালে যে আপনি ছোটলোকের আসনে বসে পড়ছেন, তা কি বুঝতে পারছেন? অবশ্য যারা ছোটলোক হয়েই যায়, যারা তাদের মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য না বুঝতে পেরে, অথবা বুঝেও না বুঝার ভান করে, নিজের তৃপ্তির প্রতি বেশ দৃষ্টি রাখেন, তারা এসব বুঝতেও পারবে না।
অতি আফসোসের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যখন সুশিক্ষিত, ভদ্রলোক দাবিদার কেউ এমনটা চর্চা করে। আরেকটু কঠিন কথা এই যে, হে ভদ্রলোক সম্প্রদায়, আপনাদের এই উঁচু মান ও স্থানের পিছনে রয়েছে যাদের ত্যাগ-কষ্ট, যারা আপনাদের এমন হাই লেভেলে পৌঁছে দিতে, নিজেদের ঘুম- নিদ্রা হারাম করেছেন, তাদেরই ভুলে যাচ্ছেন, অবহেলা করছেন!
হে মানুষ দাবিদার, হে কথিত উঁচু মানুষেরা, হে ভদ্র মহোদয়গণ, একটুখানি ভাবুন। যে বিলাসিতায়ও আপনাদের মন ভরে না, যে পজিশনেও আপনারা তুষ্ট হতে পারেন না, অথচ কত মানুষ সামান্য উচ্ছিষ্ট পেয়েই কৃতজ্ঞ। আপনাদের এই অপচয়, কুরআনের ভাষায় আপনাদের ‘শয়তানের ভাই’ বানাচ্ছে, তা কি জানেন! অথচ কুরআন -হাদীস চর্চা করেন। ধর্মীয় জ্ঞান ছড়ান, বয়ানও শুনান, অন্যদের! কিন্তু ধর্ম আমাদের কখনোই সংকীর্ণতা শেখায় না।
আপনারা আরও উঁচু হতে থাকেন। আসমান সমান উঁচা হন। যারা পিছিয়ে আছে, থাক পিছিয়ে! থিওরি এটাও বলে, আজ যারা নিঃস্ব-পথিক একদিন তারাও তাদের লেভেল পরিবর্তন করতে পারবেন হয়তো। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর’। বিশ্বাস কেবলই দয়াময় বিধাতার প্রতি। তিনি সকলের দিনই একদিন সুদিন করবেন। সেদিন যেন ভুলে না যাই বাকিদের অর্থাৎ নিচুস্তরের যারা তাদের, এই হোক শপথ ও প্রত্যয়।
লেখক: শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক।
লৌহজং, মুন্সিগঞ্জ।