
২০৪১ঃ কেমন সিরাজদিখান চাই
শোভন সারোয়ার:
ইতিহাস, সংস্কৃতি আর বহু কীর্তিমানের স্মৃতিধন্য ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুরের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র আমাদের সিরাজদিখান। বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার এই বৃহৎ উপজেলা সবুজ-সুনিবিড়, সুজলা-সুফলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অঞ্চল হিসাবে পরিচিতি। সময়ের সাথে সাথে সমগ্র বাংলাদেশের মত সিরাজদিখানও পরিবর্তনের পথে চলেছে। সরকারের উন্নয়নকল্প “ডিজিটাল বাংলাদেশ” কার্যক্রমের ছোয়া সিরাজদিখানেও পরিলক্ষিত হয়। যদিও বর্তমানকালে বেশকিছু সামাজিক অসঙ্গতি, অপসংস্কৃতি ও পরিবর্তনজনিত সমস্যা সারা দেশের মত আমাদের এতদঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে অন্তরায়।
বাংলাদেশ সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী- সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জাতি গঠনের উদ্দেশ্য যে “স্মার্ট বাংলাদেশ” ভিশন ঘোষণা করেছে, তার আলোকে স্মার্ট ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশে সিরাজদিখানের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত কিংবা ২০৪১ সালের বাংলাদেশে কেমন সিরাজদিখান চাই তা তুলে ধরা হলো।

মানবসম্পদ উন্নয়নঃ “স্মার্ট বাংলাদেশ” ধারণার চারটি স্তম্ভের মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে স্মার্ট নাগরিক। আর স্মার্ট নাগরিক তৈরি করতে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই।
বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ ও উদ্ভাবনের কারণে পেশার ধারণা বদলে যাচ্ছে। বদলে যাওয়া পেশা ও প্রযুক্তির সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুক্ত করতে সৃজনশীল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার গুরুত্ব অনেক। সিরাজদিখানের বিরাট সংখ্যক মানবসম্পদ বিদেশগামী হওয়ায় হাতে কলমে শিক্ষাকে যেমন গুরুত্ব দিতে হবে, তেমনি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে এই উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষার হার অনুপাতে সিরাজদিখানে শিক্ষার হার বেশ কম। উচ্চশিক্ষায় সিরাজদিখানকে এগিয়ে নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশের উন্নয়ন, ইউনিয়ন পর্যায়ে উচ্চ ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, মেধাবীদের বিশেষ সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন সুরক্ষা কার্যক্রমের বিকল্প নেই।
সামাজিক উন্নয়নঃ “স্মার্ট বাংলাদেশ” ধারণার আরেকটি স্তম্ভ হলো স্মার্ট সমাজ। সকলের অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠিত হলে সেই সমাজে সাম্প্রদায়িকতা থাকে না, কুসংস্কার থাকে না। সে সমাজ সমৃদ্ধির পথে ছুটতে থাকে। স্মার্ট সমাজ গড়তে আমাদের সমাজের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা অতিব জরুরি। আমাদের প্রধান শক্তি যুবসমাজের হাতেই ভবিষ্যতের সিরাজদিখান। অথচ সমস্যাগুলো সেসব তারুণ্যকেই গ্রাস করছে। যেমন- মাদক, কিশোর গ্যাং, সাইবার বুলিং ইত্যাদি। এগুলোর বাইরে দুর্নীতি, বাল্যবিবাহ, জমি দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলন সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। একটি সমাজ যতই উন্নয়ন করুক না কেন, দুর্নীতির রাশ টেনে ধরতে না পারলে সে উন্নয়নের সুফল সমাজের সকল স্তরে পৌঁছাতে পারেনা। এমতাবস্থায় সামাজিক অসঙ্গতিগুলোকে মোকাবিলা করে সিরাজদিখানকে এগিয়ে নিতে আমরা সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারি। একটি কল্যাণ সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সালিসি বোর্ডের ভুমিকা অপরিসীম। সিরাজদিখানের আয়তন ও জনসংখ্যা বিবেচনায় থানার সংখ্যা বৃদ্ধি, বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিং এর অধিকতর ভুমিকা এবং স্থানীয় সালিসি ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সিরাজদিখানের সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা রাখবে।
কৃষি জমি রক্ষা ও নদী ব্যবস্থাপনাঃ সিরাজদিখানে মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস কৃষি। কিন্তু উপজেলার প্রায় সব এলাকায় জমি ভরাট করে কৃষি উৎপাদনযোগ্য জমি নষ্ট করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের পাশাপাশি দখল-দূষণ, আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ কৃষি জমি কমার মূল কারণ। বিশেষ করে পদ্মাসেতু ও ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি পরবর্তী অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পরতে পারে।
শিল্পায়ন এবং অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তবে তা কৃষি জমি ধ্বংস করে নয়। বরং এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিকল্পিতভাবে করা গেলে যেমন কৃষি জমি রক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে তেমনি সুষম উন্নয়ন সম্ভব হবে। আমাদের সিরাজদিখান অঞ্চল ধলেশ্বরী, ইছামতী ও পোড়াগঙ্গা সহ অনেক ছোট বড় খাল বিধৌত। একসময় এসব জলাশয়ে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত, যা আজকে অনেকটা বিলুপ্তির পথে। এর প্রধান কারণ নদী ও খালগুলোর নাব্যতা সংকট। অথচ এসব জলাশয় যথাযথ খননের উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যৎ সিরাজদিখান মৎস সম্পদে আবারো পরিপূর্ণ হতে পারে। মৎস্য ছাড়াও বন্যার পানি দ্রুত নিষ্কাশন ও জলপথ বাণিজ্যে নদ-নদী বিরাট ভূমিকা রাখে।
যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ যেমন তথ্য ও প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে থাকবে, তেমনি দেশের সড়ক যোগাযোগেরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত সিরাজদিখানের যোগাযোগ নেটওয়ার্কও শক্তিশালী হতে হবে। বিশেষকরে পদ্মাসেতু চালু হওয়াতে দক্ষিণাঞ্চলের অসংখ্য গণপরিবহন ঢাকা ও চট্টগ্রামমূখী যাত্রায় সিরাজদিখান অতিক্রম করবে। এমতাবস্থায় যানযট নিয়ন্ত্রণে ঢাকা-মাওয়া জাতীয় সড়কের বিকল্প সড়ক হিসাবে সিরাজদিখান-বালুচর-ঢাকা সড়ক তৈরি করতে হবে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণঃ
ঐতিহ্যবাহী সিরাজদিখানের পাতক্ষীর ও আলুর সুনাম দেশজোড়া। এসব পণ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যান্ডিং করা গেলে সমৃদ্ধ হবে আমাদের এই উপজেলা। এ উপজেলাতেই ছড়িয়ে আছে দেড়-দু’শ বছরের প্রাচীন মঠ ও মন্দির। ভ্রমণ প্রিয়সি-পর্যটকরা এখানে এসে এসব মঠ পরিদর্শন করে থাকেন। কিন্তু সঠিক দিক নির্দেশনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে মূল আকর্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। মঠগুলোর জৌলুশ ধরে রাখার জন্য এগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষন অতি জরুরি।
এছাড়াও পদ্মহেম ধামের লালন মেলা, শেখরনগরের রায় বাহাদুর শ্রীনাথ রায়ের বাড়ি ও কালীমন্দির, ফেগুনাসার শিবমন্দির, শূলপুর খ্রিস্টান চার্চ ও ইছামতী পারের সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করে। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য রক্ষা সমৃদ্ধ সিরাজদিখানে সময়ের দাবী।
পরিশেষে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে পরিকল্পনা সরকার হাতে নিয়েছেন, তার কাজ শুরু করে এই উদ্যোগকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে আমরাও চাই ২০৪১ সালের সমৃদ্ধ “স্মার্ট সিরাজদিখান”।
লেখক : সদস্য, ঝিকুট ফাউন্ডেশন।