
প্রেম বিসর্জন
কে এন ইসলাম বাবুল
পরদিন চাঁদের হাটের ৪০ বছর পূর্তি উৎসব। সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে আমাদের যেতে হবে। সারাদিন আমি, ইনতু, হাসান, সুমন আমরা সবাই উৎসবের আয়োজনে সিনিয়র ভাইদের সাথে বেশ ব্যস্ত ছিলাম। এ উপলক্ষ্যে শিশু কল্যাণেও সংবাদ সম্মেলনে আমাদের বেশ সময় দিতে হয়েছে। চাঁদের হাটের বড় ভাইদের সাথে সুমনকে থাকতে হলো। আমি, হাসান এবং ইনতু হাসানের বাসায় চলে গেলাম। রাত এগারটা। ভাবি আমাদের খুব যত্ন করে খাওয়ালেন। হাসান বলল ভাইজান আপনি ও ইনতু শুয়ে পরেন, সকালে উঠতে হবে। হাতের কাজ সেরে আমি ও ইনতু এক রুমে ঘুমোতে গেলাম তখন রাত সারে বারটা। হাসান ও ভাবি চলে গেল তাদের বেড রুমে।
ইনতু একজন ব্লগার রাতদিন শুধু ইন্টারনেটে ব্যস্ত থাকে। ঘুম আসছিল না, তবুও ইনতুকে বললাম, এবার রাখ, ঘুম আসার চেষ্টা করি। প্রথমেই ইনতু একটি গভীর প্রসঙ্গে হাত দিয়ে বসল। যাই হোক গল্পে গল্পে মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা অনেক কথাই বলে ফেললাম। ইনতু নাছোর বান্দা। পুরো কাহিনীটা ওর শোনার অধীর আগ্রহ। আসলে এসব প্রসঙ্গে আলোচনা না করাই ভাল, কেননা এসব পেছনের ব্যপার পূণরায় উঠে এলে অনেকের মনে কষ্ট হয়ে দাড়ায়। যাই হোক তোমার যেহেতু শোনার জন্য এতটা কৌতূহল তবে সংক্ষিপ্ত করে বলব।
শুরু করলাম, ঘড়ির কাটা ঠিক রাত দুইটায়। সেই পুরনো কাহিনী। আমরা খুব ঘনিষ্ট চার বন্ধু, শৈশব থেকে একত্রে চলা-ফেরা। স্কুলে যাওয়া আসা, একত্রে মাঠে খেলাধুলা সব কিছুতেই যেন আমরা (আমি, হাসিব, বাবু ও রিটন) চারজন। কবুতরের দুই জোরা হিসেবে এলাকার অনেকের কাছে পরিচিত।
আমি, হাসিব ও বাবু, রিটনদের বাসায় সবচেয়ে বেশি সময় দিতাম। সে সময় আমাদের গ্রামে হাতে গোনা মাত্র ৪/৫ টি টেলিভিশন ছিল তাও সাদা কালো। সে সময় আমাদের মধ্যে শুধু রিটনদের বাসায় টিভি ছিল। সেজন্য আমরা ওদের বাসায় একটু বেশি যেতাম। তখন ডেসা’র বিদ্যুৎ। ভোল্টেজ ছিলনা বললেই চলে। তবে ওদের টিভিটা ন্যাশনাল ব্রান্ডের ছিল। কম ভোল্টেজেই চলত। তবে রিটনরা শহরে কিছুদিন ছিল কারণ ওর বাবা সরকারী চাকুরী করত সেই সুবাদে। এজন্য হয়তো ওরা একটু শহুরে ভাব নিয়েই চলত। ওরা এখন গ্রামেই থাকে।
আমরা চারজনই সবে মাত্র দশম শ্রেণীতে। তবে রিটনের ছোট দুই বোন ছিল একজন সুইটি ৮ম শ্রেণীতে ও আরেকজন বিউটি ৭ম শ্রেণীতে পড়ে। ওদেরকে আমরা ছোট বোন হিসেবে খুব আদর করতাম। আমরা সবাই ওদেরকে নিয়ে বেড়াতে যেতাম, মেলায় ঘুরতাম। অনেক কিছু কিনেও দিতাম। ওরা দুজনে খুবই সুন্দরী ছিল। তবে অতুলনীয় সুন্দরী ছিল বিউটি। আমাদের আপন বোন না হলেও তার চেয়ে কম ভালোবাসতাম না ওদের। বিউটি আবার বাবুকে খুব বেশি পছন্দ করত। ওর সাথে বেড়াতে যেতে কথা বলতে আরো বেশি পছন্দ করত। মাঝে মাঝে আমরা দুষ্টামী করে বলতাম এই ভাইয়া বেশি সুন্দর তাই আমাদের কম ভালোবাস আর ওকে বেশি? আচ্ছা ঠিক আছে, আমাদের সাথে তোমাকে আর নেব না, তুমি ওর সাথেই যাবে। বেশ কিছুদিন পর কেমন যেন একটা সন্দেহ মনে হলো। রিটন আবার অতটা চতুর না। সব কিছু আগে বুঝতে পারে না। আমি ও হাসিব দুজনে বাবুকে বললাম ব্যপারটা ভাল ঠেকছে না। আমাদের সকলেরই কিন্তু বোন, তোমার চলা ফেরা পছন্দ হচ্ছে না। বাবু বলল আমি লজ্জায় তোদের বলতে সাহস পাই নাই। বিউটি নাকি অনেক আগে থেকে আমাকে পছন্দ করে, ও আমাকে খুব ভালোবাসে বলে জানিয়েছে। তাছাড়া আমিও ওকে খুব ভালোবাসি তবে বোনের মতই অন্য কিছু না। আমরা বন্ধুরা সবাই সবার সাথে সত্য কথা বলি এবং একে অপরকে খুব বিশ্বাস করি। বাবু আরও বলল বিউটি স্কুলে যাওয়ার পথে অনেক বখাটে ছেলে সমস্যা করে। আমরা কতগুলোকে শাসিয়েছি আবার মুরব্বিদের জানিয়েছি। সে সব চিন্তা করেই আমি বিউটির মন ভাঙ্গিনি। আমাকে ও অনেকদিন ধরে পছন্দ করে অনেক ভালোবাসে বুঝতে পারিনি। সেদিন যখন আমাকে সরাসরি বলে ফেলল, তখন থেকে আমি গভীর চিন্তায় পরে গেলাম এবং ওকে একটু বেশি সময় দিতে চেষ্টা করলাম। বোঝাতে থাকলাম এখনও অনেক সময় আছে আমিও আছি কোথাও চলে যাচ্ছি না। সরাসরি না করতে পারছিলাম না। কারণ বখাটে কারো পাল্লায় পরে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। তবে আমাদের কারো সাথে একবার পরামর্শ করলে হতো না? বাবু বলে হতো, হুট করে শুনে আবার তোরা কিনা কি ভাবিস। এবার আমরা তিন জন পরামর্শ করলাম যাই হোক রিটন যেন না জানে তবে জানলে অনেক কষ্ট পাবে। ব্যাপারটা কিভাবে সমাধান করা যায় সে ভাবেই আগাতে হবে। সাপ মরবে ও লাঠিও ভাঙবে না। এভাবেই ৭/৮ মাস কেটে গেল। ওদের দু‘জনের সম্পর্ক যেন দু‘জনেই জানে, এভাবেই আমরা থাকলাম। মেট্রিক পরিক্ষা শুরু হলো। যথাসময়ে শেষ হলো এবং রেজাল্টও বের হলো। আমরা এক সাথে কলেজে ভর্তি হবো, কিন্তু তা হলো না। আমি ও বাবু চলে গেলাম রাজধানীতে আলাদা আলাদা কলেজে। হাসিব বাবার গাড়ির ব্যবসায় জরিত হলো। আর রিটন ভর্তি হলো এলাকার কলেজে। প্রথম প্রথম আমরা প্রতি সপ্তাহে বাড়ি চলে আসতাম। পরে আস্তে আস্তে পনের দিন বা একমাস পর পর আসতাম। সদর ঘাট থেকে লঞ্চে চড়ে আমরা বাড়ি আসা যাওয়া করতাম। আর বাবু সব সময় লঞ্চ থেকে নেমেই বিউটিদের বাড়িতে দেখা করে পরে ওদের বাড়ি যেত। বাবু আমার কাছে সব কথাই বলত। বাবু বলে আমার ইদানিং ওর প্রতি কেমন যে লাগছে বলতে পারছি না। বুকটা ছটফট করে। ও আমাকে পেলেই জরিয়ে ধরে, তবে সবার সামনে নয়। সুযোগ বুঝে নেয়। তবে ইদনিং ওর বড় বোন ব্যপারটা জানে, সে জানে আমরা দু’জনে দুজনকে বেশ ভালোবাসি এবং চুটিয়ে প্রেম করছি। তাই সে অনেক সুযোগ করে দেয়। আমি সেরকম না, কিছুতেই বুঝাতে পারছিনা, সরাসরি বলতেও পারছি না। তবে এখন আমার মনের ভিতরে কিছু একটা করে। বোঝাতে আমি পারব না। মাঝে মাঝে আমার এমন হয় ওকে না দেখলে আমার নাওয়া খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাবুর এসব কথা শুনে আমি আর ওকে কোন জবাব দিতে পারি না। ওদের সম্পর্ক অনেক গভীর তবে বাবু কিছুটা ছাপিয়েই চলে। বাবু লেখা পড়ার চাপে অনেক সময় মাসে একবার গ্রামে আসে তখনই বিউটির চিঠি চলে যায় বাবুর ঠিকানায়। কিন্তু বাবু কখনো চিঠি দেয় না, গ্রামে এসেই কথা বলে চলে যায়। এখন আর চার বন্ধুর আগের মত সময় দেওয়া হয়না বিশেষ কিছু কারণ ছাড়া।
ইন্টার পরিক্ষা শেষ আমি আর বাবু ডিগ্রিতে ভর্তি হলাম। রিটনের রেজাল্ট খারাপ হলো, হাসিব ব্যবসায় বেশ পয়সা কামিয়েছে। হাসিবের বাবা মা হাসিবকে পরের বছর বিয়ে করাবে। হাসিবের বাড়ির কাছেই বিউটিদের বাড়ি, ওর বাবা মা বিউটিকে খুব পছন্দ করে। হাসিবের জন্য প্রস্তাব পাঠাবে। কিন্তু হাসিবদের সাথে বিউটিদের পারিবারিক দ্বন্দ ছিল। তাই প্রস্তাব দিতে সাহস পাচ্ছে না হাসিবের পরিবার। হাসিবের বাবা মায়ের কথা হাসিব জেনে ফেলে। হাসিবও বিউটিকে খুব পছন্দ করত কিন্তু বন্ধুর বোন আবার আরেক বন্ধুর সাথে সম্পর্ক কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। বিউটির লেখাপড়া বন্ধ মেট্রিক খারাপ করেছে, তাছাড়া বখাটে ছেলেদের জন্য তার বাবা পড়াবে না। বিয়ের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব আসছে। হাসিবের মাথা নষ্ট। শহরে গিয়ে বাবুর সাথে দেখা করে। হাসিব বাবুর কাছে জানতে চায় বিউটির সাথে সম্পর্ক কেমন। বাবু জানায় ও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না, আমিও ওকে অনেক ভালোবাসি। আমার ফ্যামিলী মেনে নেবে না তাছাড়া আমি ওকে বাজে ছেলেদের হাত থেকে রক্ষায় ভালোবাসার অভিনয় করতে গিয়ে এখন মায়ার জালে আটকে গেছি। তবে ভাল ছেলে পেলে যদি ওর বাবা মা বিয়ে দিয়ে দেয় তাতে আমি খুশি। হাসিব বাবুকে বলে দোস্ত আমি বিউটিকে চাই তুই আমাকে দিয়ে দে। তখন বাবুর মাথায় জেন বাজ পরে। বাবু চুপ করে থাকে। হাসিবের বাবা মায়ের ইচ্ছের কথা বাবুকে জানায় হাসিব। বাবু তখন বলে আচ্ছা ঠিক আছে বন্ধুর জন্য জীবন দিতে পারি, প্রেম বিসর্জন দিতে পারব না কেন? হাসিব জানায়, শহরে আমার বড় ভাইয়ের একটা দোকান আমাকে চালাতে হবে তখন সপ্তাহে সপ্তাহে বাড়ি যাব। তখন বাবু বলে, তুই বাড়ি গিয়ে ওদের বাসায় যাবি, ওর সাথে বেশি আদর ভালোবাসা দিয়ে কথা বলবি, সময় দিবি, মেলায় নিবি, মাঝে মাঝে কিছু গিফট দিবি, সিনেমা দেখতে নেওয়ার চেষ্টা করবি। আমাদের সাথে আগে যেমন মেলায় গিয়েছে, সিনেমা দেখেছে। সিনেমা দেখতে গিয়ে আমার হাতে হাত রাখত তোরা এবং ওর ভাই সবাই সিনেমা দেখতে ব্যস্ত থাকতি ও আমার শরিরে মাথা রাখত অনেক সময়। যাক যাই হোক আস্তে আস্তে তুই আগাবি ওর দিকে, আর আমি আস্তে আস্তে দূরে সরে যাব। আর আমি কখনো ওকে চিঠি দেই নাই ও আমাকে চিঠি দিয়েছে। কিভাবে চিঠি লিখলে ও খুশি হবে সেটা আমি জানি। তাছাড়া ও আমার হাতের লেখা চিনে না। এর পর প্রতি সপ্তাহে দুইটা একটা চিঠি লিখে দিত হাসিবের নামে বাবু আর হাসিব পাশের বাড়ির এক বৌদির মাধ্যমে চিঠি দেয়া নেয়া করত। তবে হুট করে এত কিছু হয়ে যায় নি। চার পাচ মাস সময় লেগেছে হাসিবের দামী দামী গিফট বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়া। আর বাবু গ্রামে গেলেও ওদের সাথে দেখা করে না যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। বিউটি বাবুকে খুব খারাপ জানতে থাকে সে সুযোগে হাসিব জায়গাটা দখল করে নেয়। হঠাৎ ৭/৮ মাস পরে বাবু ও বিউটির দেখা হয়ে যায়, বিউটি বাবুকে বেইমান বলে চলে যায়। এরপর হাসিব ও বিউটির গভীর প্রেম চলছে। বাবুর একটি ইয়াসিকা ক্যামেরা ছিল রিল সিস্টেম সেটি হাসিব নিয়ে আসে। বিউটিদের পাশের বাড়ির বৌদির ঘরে ডেকে এনে অন্তরঙ্গ বেশ কিছু মূহুর্তের স্থির চিত্র ধারণ করে ক্যামেরায়। রিলটা হাসিব বাবুকে দেয় ওয়াস করার জন্য বাবু ছবিগুলো প্রিন্ট করে দেয়। এসব কথা বলার সময় বাবুর চোখে জল টলমল করছিল।
বিউটির বাবাকে হাসিবের বাবা প্রস্তাব দেয়, বিউটির বাবা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অন্য জায়গায় বিউটির বিয়ে ঠিক হয়। ছেলে পক্ষ দেখতে আসে খবর পেয়ে আমরা বেশ কয়েক বন্ধু চলে আসি বিয়ে যেন না দিতে পারে। ছেলের পক্ষের লোকজনকে আমরা, হাসিব ও বিউটির ডুয়েট ছবি দেখালেও অভদ্র লোক গুলো আমাদের পাত্তাই দেয় না। পরে জানলাম যৌতুক বেশি দিয়েছে। হাসিব বিউটিকে চলে আসতে বললেও বিউটি বাবা মায়ের কথার বাইরে যাবেনা বলে জানিয়ে দেয়। বিয়ে হয়ে যায়। হাসিব পাগলের মত হয়ে যায়। নেশার টেবলেট খাওয়া শুরু করে। এরপর হাসিবের বাবা মা হাসিবকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু বিউটির মোটেই সুখ হয়নি। অনেক কষ্টের পর ছয় মাসের মাথায় স্বামীকে তালাক দিয়ে চলে আসে বিউটি বাবার বাড়িতে। কিছুদিন পর আবার বিয়ে হয় ওর সমবয়সি আগের ঘরে মেয়ে আছে এমন একটি বুড়োর সাথে। বিউটিকে না পাওয়ায় দশ বছর হয়ে গেল এখনো দেশে ফেরেনি হাসিব। আমার মনে হলো সমাজ, পরিবার ও বন্ধুর জন্য প্রেম বিসর্জন দিতে হলো এদের।
অলংকরণ: © ঝিকুটপত্র
লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর লেখক ফোরামের বার্ষিক সাহিত্য সম্পাদক ‘প্রভাত’।