জাজাফি:
১৩ অক্টোবর ২০২২। আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষের জন্মদিন। যার সাথে আমার বাস্তবে কোনো দিন দেখা হয়নি। ভার্চুয়ালি একদুবার দেখা হয়েছে।এক দুবার কথা হয়েছে। সে থাকে আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে,আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। আমি চাইলেও তার সাথে বসে গল্প করতে পারি না, কফি খেতে পারি না। চাইলেও তার বা আমার লেখা নতুন কোনো গল্প দুজন দুজনকে পড়তে দিতে পারি না। সে যখন রংতুলিতে ছবি আঁকে আমি তখন চাইলেও তার পাশে বসে মুগ্ধ হয়ে সেই ছবি আকা দেখতে পারি না। সে যখন মহাগ্রন্থ আল কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে আমি চাইলেও মুগ্ধ হয়ে পৃথিবীর সব কিছু ভুলে গিয়ে সেই তিলাওয়াত শুনতে পারি না। তবে সে আমাকে হতাশ করে না। তার ছবি আকা আমি ঘরে বসেই দেখতে পাই। তার তিলাওয়াত আমি ঘরে বসেই শুনতে পাই। তার লেখা ঘরে বসেই পড়তে পারি এবং আমার লেখাও তাকে ঘরে বসেই পড়তে দিতে পারি। যদিও আমি যে আকাশের নিচে থাকি পুরো আকাশের সীমানা জুড়ে কোথাও সে নেই। সে আছে অন্য দেশের আকাশের নিচে। তবুও সে খুবই আপন,খুবই কাছের মানুষ। তার কথা বলার ধরন,তার জানার আগ্রহ, জ্ঞানের পরিধি আর অব্যহত প্রচেষ্টা আমাকে মুগ্ধ করে। মুগ্ধ করে তার বাবা মা তাকে যেভাবে সময় দেন,সাপোর্ট করেন সেটা দেখে। আমি তার থেকে নিত্যদিনই কিছু না কিছু শিখি। আমি তার কাছ থেকে শিখি বিনয়ী হতে, তার কাছ থেকে শিখি ভালো মানুষ হতে। তার কাছ থেকেই শিখি যতটা সম্ভব নিরহংকারী হতে। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র বলে যে বিখ্যাত লাইনটি পড়েছিলাম সেটির মত করেই এই মানুষটির কাছ থেকেও আমি অনেক শিখি। সে জানে অথবা জানে না যে পরোক্ষ ভাবে সে কত মানুষের শিক্ষক হয়ে গেছে যদিও মাধ্যমিকের গন্ডিও পেরোয়নি এখনো। সে একই সাথে কখনো আমার বন্ধু, কখনো আমার মেন্টর,গাইড।না সে কিন্তু কখনো এসবের একটিও দাবী করেনি বা বলেনি। আমি নিজেই ভেবে নিয়েছি এসব কথা। আমি তাকে বরাবরই ফলো করি। ফলো করি বহু আগে থেকে যখন ফেসবুকে সে ছিল না,ইন্সটাগ্রামে সে ছিল না, ইউটিউবে সে ছিল না। ফলো করি তখন থেকেই তার বাবার মাধ্যমে। তাকে আমি জেনেছি তার বাবার মাধ্যমে।আমি তার বাবার কাছ থেকেও শিখি। অনেক কিছু শিখি। এই ছোট্ট মানুষটিকে ফলো করি শুনলে সে অবাক হয়। সে যদিও বিনয়ের সাথে সব সময় স্বীকার করে সে নিজে এমন কিছু হয়নি যে তাকে ফলো করতে হবে বা তার ফলোয়ার হবে। যদিও তার ভার্চুয়াল এবং বাস্তব জীবনে সত্যিকারের ফলোয়ারের অভাব নেই। বক্তৃতা ও সেমিনারে তার নাম উচ্চারণ করে থাকেন অনেক প্রোথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। কখনো কখনো তার চেয়েও অনেক অনেক উপরের ক্লাসে পড়ুয়া ছেলে মেয়েদের পরীক্ষার প্রশ্নে সেই ছোট্ট মানুষটির সম্পর্কে বিবরণ থাকে। এই বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষ চায় প্রতিটি ঘরে ঘরে তার মত সন্তান জন্ম নিক। তার জন্য যত মানুষ প্রকাশ্যে এবং গোপনে সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করে তার কোনো হিসেব নেই।

যে বয়সে অন্যরা পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের সাথে ঠিকমত কথাই বলতে পারে না, ঠিকমত নিজের ক্লাসের পড়াই রেডি করতে পারে না, ঠিক মত নিজের দেশ এমনকি রাজধানী সম্পর্কে জানে না। সেই বয়সে সে অনেক কিছু করে। নিজের পড়া রেডি করে,বিশ্ববিখ্যাত মানুষদের সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করে। রাজনীতি,অর্থনীতি,খেলাধুলা থেকে শুরু করে ইতিহাস ঐতিহ্য,ধর্ম,বিজ্ঞান সব বিষয়ে সে সমান ভাবে আগ্রহী এবং ভেতর থেকে জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করে। আমি এই লেখাটি যখন লিখছি তখন বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে চারটা। অফিসের কাজ শেষ করে অফিসে বসেই লিখছি। চাইলে গতরাতেই লেখাটি লিখতে পারতাম তবে একটু সময়ে নিয়েছি।
আমি সব চেয়ে বেশি অবাক হই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ,সমৃদ্ধ দেশে বসবাস করেও তার হৃদয় পড়ে থাকে বাংলাদেশে। পৃথিবীর যেখানে যে প্রান্তেই সে যায় বুকের মধ্যে লাল সবুজের পতাকা নিয়ে যায়। এতো অল্প বয়সে তার হৃদয়ে যতটা দেশ প্রেম আছে তা আমি অন্তত আমার নিজের মধ্যেও কখনো দেখিনি। সে যখন কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় তখন সে চাইলেই আমেরিকাকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে। এতে বরং সে নানাবিধ সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু সে তা না করে বার বার বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেয়। বাংলাদেশের পতাকার সম্মান বৃদ্ধি করে। খুব ছোট বেলায় আমি তাকে দেখেছি তার চেয়েও বড় সাইজের বাংলাদেশের পতাকা হাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়েছে। ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে সে যখন অগণিত মানুষের সামনে কথা বলে তখন মনে হয় ১০ বছর বয়সী কেউ নয় বরং কথা বলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রফেসর। কিংবা বিখ্যাত কোনো উপস্থাপিকা। আমরা সাদা চোখে কোনো একটি বিষয়কে যেভাবে দেখি সে সেভাবে দেখেনা কখনো। ভেতর থেকে বিষয়টি জানার চেষ্টা করে।
বিশ্বনেতাদের সাথে বহুবার সে আলোচনায় অংশ নিয়েছে এবং প্রতিবারই নিজের জন্য নয় বরং বাংলাদেশের জন্য, বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনেক কিছু দাবী করেছে। আমাদের দেশের বড় বড় কথা বলা মানুষদের বড় বড় বুলি শুনে বড় হওয়া এই আমি অন্তত দায়িত্বশীলদের কাউকে ওর মত করে দাবিদাওয়া উপস্থাপন করতে দেখিনি। জাতিসংঘে, কিংবা বিশ্ব বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে সে যখন বক্তব্য দেয় তখন বার বার তার বক্তব্যে বাংলাদেশের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা উঠে আসে।সে চায় সেই সব সমস্যার সমাধানে বিশ্বনেতারা এগিয়ে আসুক। যেমন রোহিঙ্গা সমস্যা, বাল্য বিবাহ,শিশু শ্রম, সীমান্তে হত্যাকান্ড সহ অন্যান্য নানা বিষয়ে সে জোরালো মতামত উত্থাপন করে থাকে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট থেকে শুরু করে সামাজিক বনায়ন এবং সামাজিক সমস্যার সমাধান কল্পে সে জোরালো বক্তব্য দিয়েছে। তার প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে CHIL&D নামে একটি সংগঠন। বিশ্বের নানা প্রান্তে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাকে নানা সম্মানে ভূষিত করেছে,গুডউইল এম্বাসেডর হিসেবে মনোনীত করেছে।
সে পবিত্র কুরআন হিফজ করা শুরু করেছে বলতে গেলে একদম নিজ প্রচেষ্টায়। আমার বেশ মনে আছে ছোটবেলায় একবার তাকে এক টিভি উপস্থাপিকা প্রশ্ন করলে সে বলেছিল “ সন্তানকে মুখস্থ করাবেন নাকি আবিস্কারের নেশা ধরিয়ে দিবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার”। কী অসাধারণ একটি কথা। মুখস্থকে না বলার পক্ষে সে। সে নাসায় গিয়েছে,বিজ্ঞানীদের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলেছে। তার মডিউল এবং ছবি নানা স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে। যে বয়সে নিজের ক্লাসের বই পড়েই অন্যরা কুলিয়ে উঠতে পারে না সেই বয়সে তার চার চারটি বই প্রকাশ হয়েছে এবং যার মধ্যে দুটি বই প্রকাশ করেছে খোদ অ্যামাজন! পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে সেই বই কেনা যায়। সে কম্পিউটারে কোডিং শেখে,সে বাস্তব জীবনে কারাতে বা তায়কোয়ান্দো শেখে। সে বাবার সাথে স্কুলে যেতে যেতে সিএনএন,বিবিসির সংবাদ নিয়ে আলোচনা করে। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবার সাথে স্কুলে কী কী ঘটেছে তা নিয়ে গল্প করে। ছুটি কাটাতে বাবা মায়ের সাথে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। পাহাড়,সাগর সব তাকে আকর্শন করে।আইসস্ক্রেটিং তাকে মুগ্ধ করে। বিরাট বিরাট সব বুক শপে গিয়ে সে কফি খেতে খেতে বই পড়ে এবং ফেরার সময় পছন্দের সব বই কিনে নিয়ে আসে। যদি বৃষ্টি আসে তবে মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভেজে। সম্প্রতি তার খেলার সাথী পেয়েছে,তার বন্ধু পেয়েছে,তার এক প্রিয় থেকে প্রিয় সঙ্গী সে পেয়েছে। সেই সঙ্গীটি তার ভাই। ছোট্ট চাঁদের টুকরো ভাইকে কোলে নিয়ে সে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করে। ছোট্ট এই মানুষটি তাতিরা যেভাবে সুতা কেটে কাপড় বুনে তেমনি সেও তা রপ্ত করেছে। এডোবি প্রিমিয়ার প্রো দিয়ে নিজেই নিজের ভিডিও সম্পাদনা করে। তারপর তা স্যোশাল মিডিয়ায় এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে দেয় যেন তার মত অন্য অনেকেই তা থেকে শিখতে পারে।
আমার বেশ মনে আছে যখন বাংলাদেশে পরিবারের বাইরে তাকে কেউ চিনতো না তখন থেকে আমি তাকে চিনি,তার গুনমুগ্ধ ভক্ত আমি। তার কার্যক্রম আমাকে মুগ্ধ করে। বেশ কয়েক বছর আগে দৈনিক ইত্তেফাকের জন্য আমি তার ইন্টারভিউ করেছিলাম। তখনো সে স্যোশাল মিডিয়ার ছিল না। তার নামে তখন পেজও ছিল না। ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে চলার পাশাপাশি সে ও তার পরিবার সবরকম কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে চেষ্টা করে। পরিচয়ের প্রথম দিকে আমি প্রায় রোজই তাকে নিয়ে ফেসবুকে কিছু না কিছু লিখতাম। তার কার্যক্রম বাকিদের জানাতে চেষ্টা করতাম। আমার মনে হতো তার এই বিষয়গুলি সবার মাঝে যদি ছড়িয়ে পড়ে তবে এই দেশে অনেক শিশু কিশোর কিশোরী তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অমিত প্রতিভা দেখাতে পারবে। ছোটরা পড়াশোনাকে ভয় পায়, বাবা মাও নানা কারণে সময় দিতে পারে না। কিন্তু ওদের নির্ভয় দিলে,সময় দিলে ওরা যে বিশ্ব জয় করতে পারে তার প্রমান এই ছোট্ট চাদের কণা। একদিন গোটা দেশে আমি এবং পরিচিত কয়েকজন মানুষ যাকে চিনতো আজ সেই ছোট্ট মানুষটিকে চেনে গোটা দেশ এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের অগণিত মানুষ। নানা ভাষার নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষ তাকে ভালোবাসে,ফলো করে,দোয়া করে। তার মত সন্তান চায় অগনিত পিতা মাতা। তাকে ভালোবেসে নবাগত সন্তানের নাম রাখে অগণিত মা। আবার তাকে অপছন্দ করে না এমনও না। অনেক মানুষ তাকে অপছন্দও করে। ঈর্ষাও করে কেউ কেউ। কিন্তু সে সব কিছুকে খুব সুন্দর ভাবে সামলে নেয়। এইটুকু বয়সে সে পরিণত মানুষের চেয়েও ভালো সিদ্ধান্ত নেয়।
তার বাবার সাথে আমার ভালো বন্ধুত্ব। তিনি নানা সময়ে আমার সাথে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। আমি তার এই ব্যবহারেও মুগ্ধ হই। আমার মত সাধারণ একজন মানুষের সাথে তিনি সব বিষয়ে আলোচনা করেন দেখে সত্যিই আপ্লুত হই। আমি অনুভব করি বাবা হিসেবে প্রতিটি ঘরে ঘরে তার মত আদর্শ আর ন্যায়পরায়ন বাবা যদি থাকতেন,যদি তার মত সাপোর্টিভ পিতা মাতা ঘরে ঘরে থাকতো তবে কতইনা ভালো হতো। এই পিতা মাতার জন্যও আমার দোয়া ও শুভকামনা জানাই। এই ছোট্ট মানুষটির নাম ফাতিহা আয়াত। আজ তার ১১ তম জন্মদিন! তার এই ১১ তম জন্মদিনে অনেক অনেক দোয়া ও ভালোবাসা।
-জাজাফী
১৩ অক্টোবর ২০২২